জনপদ থেকে ধ্বংসস্তূপ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:১২ এএম

১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত চলছে গাজায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে আক্রমণের পর থেকে এই সংঘাত শুরু হয়েছিল। হামাসের ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর প্রতিশোধ নিতে গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় ইসরায়েল। সেখানে মানবিক সংকট এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলাকালে ৪৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। হামাস-ইসরায়েলের চলতি দফার এ সংঘাত নিরসনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই চেষ্টা করেছে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনার। চেষ্টা করেছে সাময়িকভাবে হলেও একটা যুদ্ধবিরতির। অবশেষে গতকাল রবিবার থেকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সাময়িক এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘদিন পর গাজাবাসীর জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে। কিন্তু গত ১৫ মাসের সংঘাতে গাজার যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। বিবিসি ভেরিফাই এ সংঘর্ষের ফলে গাজায় যে ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণ বিশ্লেষণ করেছে।

হতাহত

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা ৪৬ হাজার ৭৮৮ জনের মৃত্যুর হিসাব পেয়েছেন। হাসপাতাল এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যদের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ সংখ্যা তৈরি করেছেন তারা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত অর্থাৎ সংঘাতের এক বছরে শনাক্ত হওয়া মৃতদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ ছিল নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। তবে নভেম্বরের জাতিসংঘের বিশ্লেষণে নিহতের মধ্যে নারী এবং শিশুর সংখ্যা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ১ লাখ ১০ হাজার ৪৫৩ জন ফিলিস্তিনি এই সংঘর্ষে আহত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চলতি মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে জানায়, এই আহতদের মধ্যে ২৫ শতাংশের আঘাত এতটাই গুরুতর যে, তাদের জীবন আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।

মেডিসান সান ফন্তিয়েখের (এমএসএফ) সমন্বয়ক কারিন হাস্টার বিবিসি ভেরিফাইকে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে আহত রোগীদের ঠিকমতো দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘ভয়াবহ’ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গাজায় এখনো নিখোঁজ আছে কয়েক হাজার মানুষ। ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে বলা হয়, নিহতের সংখ্যা মন্ত্রণালয়ের হিসাবের চেয়েও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি হতে পারে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যখন নিহতের সংখ্যা গণনা করে, তখন তারা সাধারণ নাগরিক এবং যোদ্ধাদের আলাদা কোনো হিসাব করে না। তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ দাবি করেছে, তারা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭ হাজার হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। তারা কীভাবে এ সংখ্যা নির্ধারণ করেছে, তা প্রকাশ করেনি।

অবকাঠামো-হাসপাতাল ধ্বংস

 সংঘাতে গাজার অবকাঠামোগত ক্ষতির মাত্রা ব্যাপক। সিএনওয়াই গ্র্যাজুয়েট সেন্টারের অধ্যাপক কোরি শের এবং ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জামন ভ্যান ডেন হোক স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে গাজার ক্ষয়ক্ষতির পরিসর যাচাই করেছেন। ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির বিশ্লেষণে তারা অনুমান করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

ইসরায়েল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শহুরে এলাকায় বোমাবর্ষণ করেছে এবং কিছু অবকাঠামোয় একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে।

জাতিসংঘের স্যাটেলাইট সেন্টারের (ইউএনওস্যাট) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শুরুতে গাজার ৬৯ শতাংশ ভবন ও স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে গাজার রাস্তাঘাটের ৬৮ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

জাতিসংঘ আরও জানিয়েছে, অনেক হাসপাতাল এবং এর আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একাধিক উদাহরণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘের তথ্যে বলা হয়েছে, গাজার ৫০ শতাংশ হাসপাতাল এখন বন্ধ গেছে। বাকি হাসপাতালগুলোয় আংশিকভাবে কাজ চলছে। যার মানে হলো, হাসপাতালগুলো খোলা আছে ঠিকই কিন্তু তারা দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং জটিল আঘাতের কোনো চিকিৎসা দিতে পারছে না।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে অন্তত ১ হাজার ৬০ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন। গাজার ছয়টি পাবলিক কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং একমাত্র ইনপেশেন্ট সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালও এখন আর চালু নেই বলে সেভ দ্য চিলড্রেন বিবিসি ভেরিফাইকে জানিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০ লাখ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন, যা মোকাবিলা করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষার ক্ষয়ক্ষতি

গাজার শিক্ষার খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আইডিএফ জানায়, তারা জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে ৪৯টি স্কুল ভবনে হামলা চালিয়েছে। ডিসেম্বরের শুরু থেকে ১৩টি স্থানে এ ধরনের হামলার যাচাই করা ফুটেজ পেয়েছে বিবিসি ভেরিফাই। এই স্থানগুলো তখন আর স্কুল হিসেবে চালু ছিল না। বরং বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু স্কুল ভবনে হামলায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা গাজায় শিক্ষা স্বাভাবিক করতে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। বিবিসি দেখিয়েছে, ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযান শুরুর পরপর কীভাবে শত শত পানির লাইন এবং স্যানিটেশন সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করে দিয়েছে। অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ অর্থাৎ মানুষের বাড়িঘর থেকে শুরু করে জনসেবা কেন্দ্র আবার নির্মাণ করাই হবে সামনের বছরগুলোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। মে মাসে জাতিসংঘ অনুমান করেছিল যে গাজা পুনর্গঠনে ৪০ বিলিয়ন বা ৪ হাজার কোটি ডলার খরচ হতে পারে।

ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি 

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার সমন্বয় অফিস-ওসিএইচএ ধারণা করছে, গাজায় অন্তত ১৯ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা কি না গাজার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এই মানুষ গাজায় তাদের বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ একাধিকবার একস্থান থেকে অন্যস্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই শুরু থেকেই গাজার এই মানুষদের একস্থান থেকে অন্যস্থানে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ-নির্দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। গাজার ২৩ লাখ মানুষের প্রায় সবাইকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে, কারণ ইসরায়েল টানা আক্রমণ চালিয়েছে এবং বড় আবাসিক এলাকাগুলো দ্রুত খালি করার নির্দেশ জারি করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অক্টোবর থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা থেকে মানুষকে সরে যেতে বলা হয়। কারণ ইসরায়েল উত্তর গাজায় বড় আকারে হামলা চালায়। এমনকি মানবিক অঞ্চল (হিউমেনিটেরিয়ান জোন) যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যেতে বলেছিল আইডিএফ, সেখানেও তারা বহু বিমান চালায়। সত্যি বলতে, ১৫ মাসে গাজায় আক্ষরিক অর্থেই কোনো মানবিক অঞ্চল বা করিডর ছিল না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত