ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি টানা চারবার ক্ষমতায় বসেছেন। তিনি ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাধারণত, আইন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার রীতি নেই। তবে রুজভেল্ট চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরই একই ব্যক্তির সর্বোচ্চ দুবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার বিষয়টি আইনে পরিণত করা হয়।
১৯৩২ সালের নভেম্বরে রুজভেল্ট যখন প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন মহামন্দায় পর্যুদস্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। পরের বছর মার্চের আগেই দেশটিতে বেকারের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখে পৌঁছায়, প্রায় সব ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম ১০০ দিনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে রুজভেল্ট একের পর এক প্রস্তাব করেছেন এবং কংগ্রেসে তা অনুমোদন দিয়ে গেছে।
রুজভেল্টের চেষ্টায় ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেকটা ঘুরে দাঁড়ায়। নানা বিভাগে সংস্কারের উদ্যোগ দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে রুজভেল্টের জনপ্রিয়তা বাড়ায়; যদিও ব্যবসায়ী ও ব্যাংকাররা দিন দিন তার বিপক্ষে চলে যেতে থাকেন। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ভূমিকার কারণে ১৯৩৬ সালে বিপুল ভোটে জিতে দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন রুজভেল্ট। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদেও দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ করে গেছেন রুজভেল্ট।
রুজভেল্ট যখন নিজের তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন, তখনো মহামন্দার প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। হিটলারের জার্মানি ফরাসি বাহিনীকে পরাজিত করে ফেলেছে।
দেশে ও দেশের বাইরের অস্থির ওই সময়ই রুজভেল্টের সামনে রীতি ভেঙে তৃতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। বিশ্বাস করা হয়েছিল, অস্থিতিশীল ওই পরিস্থিতির সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তিনিই দেশে ও দেশের বাইরে স্থিতিশীলতা ফেরাতে পারবেন।
১৯৪০ সালের জুলাইয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন রুজভেল্ট। তার ওই সিদ্ধান্ত দলের ভেতরেই অনেককে অসন্তুষ্ট করেছিল। তবে সব পেছনে ফেলে সে বছর ৫ নভেম্বরের ভোটে জিতে যান রুজভেল্ট। তৃতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে ইতিহাস গড়েন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো একজন ব্যক্তির টানা তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির সেটিই প্রথম। রুজভেল্ট সে বছর ভোটে জেতার প্রায় এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধন করে একজন ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়া আটকে দেওয়া হয়।
১৯৪০ সালে বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্টের তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিরুদ্ধে ঘোরতর আপত্তি তোলা হয়েছিল। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি ছিল, রিপাবলিকান প্রার্থী ওয়েন্ডেল উইলকি যোগ্য প্রার্থীই নন। তারা উইলকিকে ‘তৃতীয় শ্রেণির’ প্রার্থী বলে বর্ণনা করেছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে এসে রুজভেল্ট জোরের সঙ্গে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ইউরোপের যুদ্ধ থেকে আমেরিকাকে তিনি বাইরে রাখবেন। জনগণ তার ওই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেছিল এবং তিনি ভোটে সহজ জয় পান।
প্রতিশ্রুতিমতো রুজভেল্ট আমেরিকাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে সরিয়েই রেখেছিলেন। কিন্তু খুব বেশি দিন তিনি নিজের এই প্রতিশ্রুতি ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে আক্রমণ করে বসে যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেওয়া জাপান। হঠাৎ আক্রমণের শিকার হলেও বিস্ময়ের ঘোর কাটতে যুক্তরাষ্ট্রের খুব বেশি সময় লাগেনি। পার্ল হারবার আক্রান্ত হওয়ার পরদিন জাতীয় বেতারে এক ভাষণে রুজভেল্ট ‘দিনটি ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে থাকবে বলে’ ঘোষণা দেন।
সর্বশক্তি নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধ করতে ১ কোটি ৬০ লাখ আমেরিকান পুরুষকে জড়ো করা হয়। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৫ হাজার প্রাণ হারান। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও নৌবাহিনীর প্রধান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজের এই সাংবিধানিক দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছেন রুজভেল্ট। তিনি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা জোসেফ স্তালিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলেন। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র এবং যুদ্ধসরঞ্জাম সরবরাহ করে অ্যাডলফ হিটলারের জার্মানিকে হারাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় এক ভাষণে রুজভেল্ট বলেছিলেন, বাক্স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, ইচ্ছার স্বাধীনতা ও ভয় থেকে মুক্তির জন্য তিনি এই যুদ্ধকে বেছে নিয়েছেন।
১৯৪৪ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দ্বাদশ বছরে পদার্পণ করেন রুজভেল্ট। দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরও একটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এদিকে রুজভেল্টের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে অক্ষশক্তিকে শুধু হারালেই চলবে না; যুদ্ধের পর দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্য মিত্রদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসতে হবে। তিনি এসব কাজ শুরুও করেছিলেন।
কিন্তু কয়েক মাস ধরে তার শরীর দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। কিন্তু রুজভেল্টকে তখন ক্ষমতার নেশায় পেয়ে বসেছে। চিকিৎসকদের সতর্কবাণী উপেক্ষা করে দুর্বল শরীরেই তিনি দলীয় মনোনয়ন গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু রুজভেল্টের স্বাস্থ্য নয়, বরং সেবার তার রানিং মেট বেছে নেওয়া নিয়েও ডেমোক্রেটিক পার্টিতে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। নিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ওয়ালেসকে বাদ দিয়ে রুজভেল্ট সেবার রানিং মেট হিসেবে বেছে নেন হ্যারি এস ট্রুম্যানকে। দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়েই নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। জনগণের সামনে নিজেকে যথেষ্ট সুস্থ দেখাতেও সক্ষম হন। আগের তিনবারের মতো ভোট না পেলেও ঠিকই জিতে যান রুজভেল্ট।
১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে ইয়াল্টা সম্মেলনে যোগ দিতে ১৪ হাজার মাইল উড়ে যান রুজভেল্ট। সেখানে নানা বিষয় নিয়ে তিনি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল নানা বিষয়ে সোভিয়েত নেতা স্তালিনের সঙ্গে রীতিমতো বিরোধে জড়ান। ওই সম্মেলন থেকে ফেরার পরদিন ১ মার্চ কংগ্রেসের সামনে সম্মেলনের প্রতিবেদন দিতে আসেন তিনি। নিজের ১২ বছরের প্রেসিডেন্ট–জীবনে প্রথমবারের মতো হুইলচেয়ারে করে জনসমক্ষে আসেন রুজভেল্ট, হুইলচেয়ারে বসেই ভাষণ দেন।
মার্চের শেষ দিকে অবকাশযাপনে ওয়াশিংটন থেকে জর্জিয়া যান রুজভেল্ট। সেখানেই ১২ এপ্রিল মারা যান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র ৮২ দিন পর। মৃত্যুর কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর