কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ হবে সুপ্রিম কোর্টে

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৩০ এএম

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। ‘সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ হবে স্বতন্ত্র কাউন্সিলের মাধ্যমে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। পরে সন্ধ্যায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। গত ১৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। এত দিন সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ দিতেন। এ নিয়ে কোনো আইন ছিল না। বিচারক নিয়োগে বয়সের কোনো বিধান ছিল না। রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারক নিয়োগের অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে আইনপ্রণয়ন করতে আইন, বিচারসংশ্লিষ্টসহ বিভিন্ন মহল থেকে নানা সময়ে দাবি উঠেছে। অবশেষে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে এ অধ্যাদেশটি জারি করল অন্তর্বর্তী সরকার।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই কাউন্সিল গঠিত হবে এবং প্রধান বিচারপতি কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হবেন। তার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের দুজন বিচারক (একজন কর্মরত ও একজন অবসরপ্রাপ্ত), হাইকোর্টের দুজন বিচারক (একজন বিচার কর্মবিভাগ থেকে নিযুক্ত হাইকোর্টের বিচারক), অ্যাটর্নি জেনারেল ও প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত একজন আইনের অধ্যাপক বা আইন বিশেষজ্ঞ নিয়ে কাউন্সিল গঠন হবে। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কাউন্সিল নিজ উদ্যোগে ও গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উপযুক্ত এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে। বিচারক হওয়ার যোগ্য বা উপযুক্ত ব্যক্তিরা আবেদন করতে পারবেন। কাউন্সিল প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের পর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবে এবং এই কাউন্সিলের নাম হবে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। বিচারক হতে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি প্রার্থীর বয়স ৪৫-এর নিচে হতে পারবে না।

সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগের উদ্দেশ্যে কাউন্সিল ব্যক্তি যোগ্যতা নিরূপণ ও বিবেচনা করবে এবং সুপারিশ করবে। এ ছাড়া আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আপিল বিভাগে শূন্যপদে সংখ্যার আলোকে হাইকোর্টে কর্মরত জ্যেষ্ঠ বিচারকের যোগ্যতা নিরূপণ ও বিবেচনাসহ নির্ধারিত নিয়োগযোগ্য বিচারকের সংখ্যার অতিরিক্ত যুক্তিসংখ্যক নামসহ একটি তালিকা সুপারিশ আকারে প্রণয়ন করা হবে। কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত সুপারিশ প্রধান বিচারপতি সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার পরামর্শে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির পরামর্শ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ করা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে বিচারক পদে নিয়োগ দেবেন।

গতকাল সচিবালয়ে আইন ও বিচার উপদেষ্টা আসিফ নজরুল হাইকোর্টে বিচারক পদে পরবর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া এই কাউন্সিলের মাধ্যমে হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের আমলে যে অনাচার, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হতো, মানুষকে যে দমন-নিপীড়ন করা হতো, তার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম ছিল উচ্চ আদালত। সেখানে মানুষ প্রতিকার পেত না। এর কারণ ছিল, রাজনৈতিক সরকারগুলো উচ্চ আদালতে সম্পূর্ণভাবে দলীয় বিবেচনায়, অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ লোকদের বিচারক নিয়োগ দিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চ আদালতে যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিরা বিচারক হিসেবে নিয়োগ না পান, তাহলে দেশের ১৭ কোটি মানুষের মানবাধিকারের প্রশ্নটি অমীমাংসিত ও ঝুঁকির মধ্যে থেকে যায়।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘উচ্চ আদালতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ, দক্ষ ও দলনিরপেক্ষ এবং প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরা বিচারক হিসেবে নিয়োগ হবেনÑ এমন একটি চাহিদা সমাজে বহু বছর ধরে ছিল। এখন এ বিষয়ে আইন হয়েছে। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারকরা নিয়োগ পাবেন।’

আসিফ নজরুল গতকাল জানান, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় এবং স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার দাবি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আছে। এটি একটি জাতীয় ঐকমত্যে পরিণত হয়েছে। এটির উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। খুঁটিনাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটু সময় লাগছে। অধ্যাপক আসিফ নজরুল স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস (রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী) চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়ে বলেন, কিছু অভিযোগ আছে, সরকারি কৌঁসুলিরা যেহেতু দলীয়ভাবে নিয়োগ পান, সেজন্য তারা অনেক সময় নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারেন না। রাষ্ট্রের পক্ষে ভূমিকা পালন না করে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ভূমিকা পালন করেন। এর সমাধান হচ্ছে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্যে আইন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এক মাসের মধ্যে এটি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত