ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পরদিনই বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের জোট কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। গত মঙ্গলবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদ্য শপথ নেওয়া মার্কো রুবিও, ভারতের এস জয়শঙ্কর, অস্ট্রেলিয়ার পেনি ওং ও জাপানের আইওয়া তাকেশি। বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে চার মন্ত্রীর যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ইন্দো-প্যাসিফিককে অবাধ ও মুক্ত রাখার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেন তারা।
প্রশান্ত মহাসাগরে চীনা আধিপত্য রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চারটি দেশের এই নিরাপত্তা সংলাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান হুমকির প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা জোরদারে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতে আরও বলা হয়, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে আরও অবাধ ও মুক্ত রাখার লক্ষ্যে যৌথ প্রতিশ্রুতি ছিল তা পুনর্ব্যক্ত করছি। আমরা আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখ-তা সমুন্নত ও সুরক্ষিত থাকবে।
চীনকে ইঙ্গিত করে বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা চার দেশ এই প্রত্যয় ধারণ করি যে, সমুদ্রসীমাসহ সর্বক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, অর্থনৈতিক সুযোগ, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির ভিত্তি। একই সঙ্গে আমরা বলপ্রয়োগ বা নিপীড়নের মাধ্যমে এ স্থিতাবস্থা বদলে ফেলার যেকোনো একতরফা পদক্ষেপেরও জোরালো প্রতিবাদ জানাই। কোয়াডের পরবর্তী শীর্ষ বৈঠক ভারতে অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে তার প্রস্তুতিতে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এখন থেকে নিয়মিত বসবেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের ঘণ্টাখানেক পর ভিডিও আলাপনে যুক্ত হয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। নিজেদের মধ্যে এই ভার্চুয়াল আলাপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘উচ্চতর স্তরে’ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তারা। পুতিন বলেন, বাইরের চাপ সত্ত্বেও দুই দেশ পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত করতে কাজ করছে। শি জিনপিং বলেন, কৌশলগত সমন্বয় গভীর, সমর্থন শক্তিশালী করা এবং বৈধ স্বার্থ রক্ষায় একযোগে কাজ করতে হবে।
মঙ্গলবার বেইজিংয়ের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দেন ট্রাম্প। আর ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে আলোচনা না করলে রাশিয়াকেও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ বিষয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের অবসানকে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। দ্রুতই এ বিষয়ে দাপ্তরিক তৎপরতা শুরু করবেন তিনি। ইতিমধ্যে একটি খসড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির নথি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। শুধু এই দুই দেশ নয়, ফেব্রুয়ারি থেকে দুই প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর ওপরও শুল্কারোপের কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। নির্বাচনে জেতার পর মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রতিশ্রুতি দেন ট্রাম্প। এই দুই দেশের মোট রপ্তানির মোট ৮০ ও ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রে যায়। তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প বেইজিংয়ের পণ্যে ঊর্ধ্বে ৬০ শতাংশ কর আরোপের কথা বললেও, মত বদলে ১০ শতাংশ কর আরোপের কথা বলেছেন ট্রাম্প। তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব জুড়ে নতুন বাণিজ্য যুদ্ধের শুরু হবে। যার ভুক্তভোগী হবেন কোটি কোটি মানুষ। ট্রাম্পের এই শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত থেকে বাদ যাচ্ছে না ইউরোপীয় ইউনিয়নও। ইইউ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
নিজের প্রথম দিনেই অভিবাসনসংক্রান্ত আদেশ জারি করে হইচই ফেলে দিয়েছেন এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। তবে এমনটা যে ঘটবে, তা অনুমিতই ছিল। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অনেক ভারতীয়র ওপর। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৮ হাজার ভারতীয় অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হবে। আর নথিপত্রহীন এসব ভারতীয়কে ফেরত নেবে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোয় প্রকাশিত খবরে ভারতের সরকারি মহলের এ চিন্তাভাবনার কথা জানা গেছে। নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের তাগিদে এবং বৈধভাবে আরও বেশি ভারতীয় যাতে সে দেশে যাওয়ার সুযোগ পান, সে কারণে ভারত সরকার এমনটা ভাবেছ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে, ট্রাম্প মনোনীত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের বিরুদ্ধে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। হেগসেথের ভাইয়ের সাবেক স্ত্রী ড্যানিয়েল হেগসেথ সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির কাছে এ-সংক্রান্ত একটি হলফনামা দিয়েছেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, সাবেক দ্বিতীয় স্ত্রীর ওপর নিপীড়ন চালাতেন হেগসেথ। হলফনামার একটি অনুলিপি থেকে এমন তথ্য জানতে পেরেছে সিএনএন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে উপকূলরক্ষী বাহিনী কোস্ট গার্ডের প্রধান কমান্ড্যান্ট অ্যাডমিরাল লিন্ডা লি ফাগানকে বরখাস্ত করেছেন ট্রাম্প। লিন্ডা যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর কোনো শাখার প্রথম ইউনিফর্মধারী নারীপ্রধান ছিলেন।
