বিদায়ী আয়নায় নক্ষত্রের ঘোড়া

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৩:০৭ এএম

সুমন আমাকে কচিভাই ও তুমি বলত। পরিবারের বাইরে সে একমাত্র মানুষ যে এমন করে আমাকে ভাই ও তুমি বলত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আশির দশকের শুরুতে দুই স্মার্ট তরুণের দেখা মিলত। বিষ্ণু ও সুমন। তখন দুজনেই স্বননের আবৃত্তিশিল্পী। ওদের চুলের ভঙ্গি, পোশাক-আশাক, জামা ইন করা, কথা বলা, বিষ্ণুর উদাস রোমান্টিক লুক, সুমনের ধারালো বুদ্ধিদীপ্ত লুক, প্রেম ও বন্ধুত্বের ধরন অনুধাবন করি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল অনুসরণীয়। মঙ্গলবার সুমন স্বর্গে চলে গেল। আমার ইচ্ছা রইল পৃথিবীর অসমাপ্ত আড্ডাগুলো সেখানে তার সঙ্গে দেব। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আমি ঢাকা ছেড়ে আসি। তখন সুমন ঢাকায় থিতু হয়েছে। তারপর ত্রিশ বছর কেটে গেছে। তারপর আর মনে রাখার মতো দেখা হয়নি। এর মধ্যে শেষ স্মরণীয় সাক্ষাৎটি ঘটেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটে। সুমন ও তার বন্ধু লিখন ঢাকাগামী বাসের জন্য অপেক্ষারত। আমরা টুকটাক কথা বলছি। লিখন বলছে, তার এক ক্ষীণাঙ্গী শ্যামলা সহপাঠীর কথা। সুমন উদাস স্বল্পবাক সিগারেট ফুঁকছে, হয়তো রোমন্থন করছে মতিহার সবুজের তারুণ্যের স্মৃতি। ক্ষণজীবী ছোটকাগজ পেঁচা’র দ্বিতীয় খণ্ডে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ফয়জুল ইসলাম সুমনের কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। পেঁচা’র দুই উল্লেখযোগ্য কবি অসীম কুমার দাস ও বিষ্ণু বিশ্বাসের আড়ালে  সুমনের কবি প্রতিভা আড়ালে পড়ে যায়। তারুণ্যে মানুষের জীবন তালগোল পাকানো থাকে। বোধ করি সাহিত্যিকদের জীবন, তারুণ্যে একটু বেশি পরিমাণে তালগোল পাকানো থাকে। আমরা পেঁচা’র কবি লেখকরা কিছু সময়ের জন্য মিলেমিশে থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। বিষ্ণু গিয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের এক অজপাড়াগাঁয়, অন্যরা হেথায় সেথায়। গত বছর দশেকে সুমনকে নতুন করে জানতে পারি। সে নিয়েছে গদ্যের পথ। মাঝে শেখ আবদুল হাকিম মারা গেলে সুমন ভীষণ মর্মাহত হয়। আমাকে তার জীবনের একটি অজানা অধ্যায়ের কথা ফোনে বলে। সুমন স্থায়ী পেশায় যোগ দেওয়ার আগে সেবা প্রকাশনীতে কাজ করেছিল। তখন গদ্য রচনার অনেক খুঁটিনাটি সে শেখ আবদুল হাকিমের কাছে জানতে পারে। রহস্য-রোমাঞ্চ যারা লেখেন তাদের প্রতি আমার বিশেষ একটি শ্রদ্ধা আছে। ফলে চমৎকৃত হয়েছিলাম।

কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির ছিলেন ফয়জুল ইসলাম সুমনের বিশেষ গুণগ্রাহী। তিনি ওকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছেন। বেদনা এটুকু সুমনের সঙ্গে বাস্তবে ঘনিষ্ঠতার যুগটাতে তার প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে পারিনি। তার কথাসাহিত্যিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় রাখতে পারিনি কোনো ভূমিকা। আমাদের চারপাশের সুন্দর ও বর্ণিল মানুষেরা আমাদের নিজ নিজ পৃথিবীকে মোহনীয় করে। সুমন ছিল আমার পৃথিবীর এক আনন্দের নাম। সুমনের প্রস্থান যেন আমারও প্রস্থান। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত