আগামী নির্বাচনে আ.লীগের অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করার গুঞ্জন থাকলেও দলটি আদৌ ফিরতে পারবে কি না, তা নিয়ে নানারকম সংশয় দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে নানারকম বক্তব্য এসেছে বিভিন্ন সময়ে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে এক পোস্টে লিখেছেন, গণহত্যা সমর্থনকারী আওয়ামী লীগের সমর্থকরা ভ্রান্তিতে আছেন যে, দেশ নির্বাচনের দিকে ফিরে গেলে তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্বীকার না করলে এবং খুন ও গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নির্মূল না করা পর্যন্ত এটি সম্ভব নয়। পাশাপাশি ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত আওয়ামী লীগের সদস্য এবং এর সহযোগীদেরও বিচার হবে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন বিদেশি কূটনীতিক এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে জানিয়ে শফিকুল আলম আরও লিখেছেন, তারা খুব কমই সমঝোতার বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছেন। তারাও বুঝতে পেরেছেন যে, অপরাধীরা যদি তাদের অপরাধ স্বীকার না করে, তাহলে কীভাবে সমঝোতার আহ্বান জানানো যায়? বরং তারা সংস্কার এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক করার বিষয়ে বেশি সমর্থন জানিয়েছেন।

‘আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড এখন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিকেও নাড়া দিয়েছে। বিশ্ব তাদের অপরাধের জন্য জেগে উঠেছে। তবুও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা চুপ করে নেই। তবে মনে হচ্ছে বিশ্ব এগিয়ে গেছে এবং বাংলাদেশে একটি নতুন সূচনার অপেক্ষায় রয়েছে’ লিখেছেন শফিকুল আলম।

প্রেস সচিব তার বার্তায় আরও লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক অধিকার গোষ্ঠীগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে জুলাই-আগস্টে নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কীভাবে নির্মমভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। বিশেষ করে আমি জনসাধারণকে যাত্রাবাড়ী হত্যাকাণ্ড এবং হৃদয় হত্যার ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র দেখার জন্য অনুরোধ করব।’

আরও তথ্যচিত্র আসছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে সংঘটিত অপরাধ তুলে ধরার জন্য তথ্যচিত্র তৈরি করছেন।

আওয়ামী লীগের সমর্থকরা দিনের পর দিন অর্থ খরচ করে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, রক্ষী বাহিনীর হত্যাকাণ্ড এবং শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা চালিয়ে গেছে বলেও স্ট্যাটাসে অভিযোগ করেন শফিকুল আলম। এ বিষয়ে তিনি আরও জানান, বর্তমান প্রজন্ম এবার জেগে উঠেছে এবং তারা স্বৈরশাসনের প্রতিটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে সজাগ রয়েছে। তাদের প্রচেষ্টা প্রতিদিন পুরনো স্মৃতিকে সতেজ করছে।

এর আগে গত ১৫ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শহীদ ও আহতদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো আপস করার সুযোগ নেই।

এর চার দিনের মাথায় ১৯ জানুয়ারি রাজধানীতে কৃষি সাংবাদিকতাবিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গে প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে যাদের হাতে রক্ত আছে, তাদের সবার বিচার হবে। দলটির নেতাদের মধ্যে এখনো কোনো অনুশোচনা নেই। তবে তিনি এও বলেন যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা এ সরকারের নেই। তাদের নিষিদ্ধের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে রাজনৈতিক দলগুলো।

প্রধান উপদেষ্টা যা বলেছেন: গত ২১ নভেম্বর মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, আওয়ামী লীগের যারা হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। বিচারে অপরাধী প্রমাণিত না হলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার পাবে। যারা অপরাধী নয় তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য অন্যদের মতোই স্বাধীন। তাদের (আওয়ামী লীগ) বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভিত্তিতে লড়াই করব আমরা। হত্যা ও নির্যাতনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের পরই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে স্বাগত জানানো হবে বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টা জানান, প্রত্যেককে সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা হবে এবং যারা হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের জন্য দায়ী, তাদের বিচার সম্পন্ন হলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য স্বাগত জানানো হবে। তিনি বলেন, ‘তারা অন্য যে কারও মতোই নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা ভোগ করবে। আমরা তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব।’

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সংস্কার প্রধানের বক্তব্য: সরকার বা আদালত যদি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করে, তাহলে দলটির নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই বলে গত ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক মতবিনিময় সভায় মন্তব্য করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন।

আওয়ামী লীগ পরবর্তী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য ছিল ‘এটা মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে। এটাও শোনা যাচ্ছে যে, কেউ কেউ মামলা করেছে কোর্টে। এই দল যাতে নির্বাচনে না আসতে পারে, সেটার আদেশ চেয়ে। কোর্ট যদি রায় দেয়, যেভাবে রায় দেয়, সেভাবে ব্যবস্থা নেব। আর না হলে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার।’

সিইসি বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক দলগুলো কোনো সিদ্ধান্ত না নেয় বা কোর্ট থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে উই আর আনডান। ৭২ সালের পর থেকে তারা রেজিস্টার্ড অবস্থায় আছে। আমরা তো বাদ দিতে পারি না।’

এদিকে গত বছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি রংপুরে এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি কোনো বাধা দেখছেন না।

তার ওই বক্তব্যের পর তা প্রত্যাখ্যান করে ওই রাতেই বিবৃতি দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগের বিচার হতে হবে। তার আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনের প্রশ্নই অপ্রাসঙ্গিক।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো একই অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম জাতীয় নাগরিক কমিটিও।

পরে অবশ্য জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বদিউল আলম মজুমদার দাবি করেন, তার বক্তব্য গণমাধ্যমে বিকৃতভাবে প্রচার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোনো দলকে বাদ দেওয়া কিংবা ভোটে সুযোগ করে দেওয়ার কোনো বিষয়, এটা আমাদের প্রস্তাবের বিবেচনার মধ্যেও নেই।’

নির্বাচন সংস্কার কমিশন মনে করছে, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের যে আইন রয়েছে তাতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা না হলে কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ায় দলটি দোষী সাব্যস্ত না হলে তাদের ভোটে অংশগ্রহণের একটি সুযোগ রয়েছে।

উপদেষ্টারা যা বলছেন : গত ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, আমরা আগেও বলেছি কাউকে টার্গেট করে বিচার করা হচ্ছে না। একটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যে বিচার হচ্ছে। আমরা যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করিনি, রাজনীতিতে কোনো দল কী অবস্থানে থাকবে সেই সিদ্ধান্ত সেই দল নেবে। সেটি অন্তর্র্বর্তী সরকারের ওপর নির্ভর করছে না।

একই প্রসঙ্গে আসিফ নজরুল বলেন, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিভিন্ন আইন আছে। আর যুদ্ধাপরাধীদের দায়ে বিচারের কথা সংবিধানে আছে। আমরা করিনি বা আমরা করব না সেটি কথা নয়। আমরা বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। সুষ্ঠুভাবে বিচার হওয়ার পর আমরা গণহত্যার সঙ্গে দল সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে যেই ধরনের রায় পাব, তার ওপর ভিত্তি করে বহু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সুযোগ আমরা পাব।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকার এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে বছরের প্রথম দিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে কোন দল অংশগ্রহণ করবে আর কোন দল অংশগ্রহণ করবে না, এটা তো আমরা বলে দেব না। যে দল অংশগ্রহণ করতে চায় সে দল করবে। কোন দল কেমন করে অংশগ্রহণ করবে সেটা তো সে দলকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত