ক্লাউসকে ড. ইউনূস

নির্ভয়ে ভোটদান নিশ্চিত করা হবে 

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:২১ এএম

বাংলাদেশের নাগরিকরা যেন কোনো বাধা বা হুমকি ছাড়াই অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন সেই প্রক্রিয়া তৈরি করার ওপর জোর দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শোয়াবের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ডব্লিউইএফ-এর বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে ক্লাউস শোয়াব ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গত বছর জুলাই মাসে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে বৈষম্য নিরসনের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা ঢাকার দেয়ালগুলোতে গ্রাফিতি এঁকে তাদের আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন প্রকাশ করেছে।

ড. ইউনূস বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগই হয়নি, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার এজেন্ডা তুলে ধরে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ৮৪ বছর বয়সী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশের মানুষ কোন ধরনের নির্বাচন চায়, সেটি না জেনে সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে না। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন আয়োজনের অপেক্ষায় রয়েছে, তবে এখন দেশের জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রক্রিয়াটি কেমন হবে। তারা কি ছোট পরিসরের সংস্কার কর্মসূচিতে যাবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার চাইবে। খবর বাসসের।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যদি মানুষ দ্রুত সংস্কার চায়, তাহলে আমরা এ বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়েছি। আর যদি বলে, না আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দরকার, তাহলে আমাদের আরও ছয় মাস সময় লাগবে।’

বর্তমান প্রজন্মকে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম আখ্যায়িত করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এই প্রজন্মের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি বর্তমান প্রজন্মকে বদলে দেওয়ার কারণে তারা এখন শুধু বাংলাদেশি আর তরুণ নয় বরং সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের অংশ হয়ে গেছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রজন্ম পুরনো বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায় না, তাই একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তরুণদের কাজের প্রতিটি অংশে ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্য একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হচ্ছে। সব রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের সংগঠনের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করা হবে। তিনি আরও জানান, তার সরকার বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ইতিবাচক ধারায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। ইতিমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গতি ফিরে এসেছে।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূসের বক্তব্যে মুগ্ধ হন ক্লাউস শোয়াব এবং আধাঘণ্টার আলাপচারিতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত ২১ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোস শহরে পৌঁছান ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। গতকাল ছিল তার সুইজারল্যান্ড সফরের শেষ দিন। এদিন তিনি সাতটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন।

ডব্লিউটিও মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক : ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে গতকাল শুক্রবার প্রধান উপদেষ্টা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকানজো ইওয়েলার সঙ্গে বৈঠক করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী রে ডালিওর সাক্ষাৎ : ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মারিনো ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ডালিও ফ্যামিলি অফিস-এর প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী রে ডালিও। এ ছাড়া জেনেল গ্রুপের (রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল কোম্পানি) নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আমের আলীরেজা শীর্ষ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

‘থ্রি জিরো’ আন্দোলনের প্রশংসায় আল গোর : সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর কার্বন নিঃসরণ, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ, দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব দূরীকরণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্যোগে চালু হওয়া বিশ্বব্যাপী ‘থ্রি জিরো’ আন্দোলনের প্রশংসা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে আল গোর অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি ‘থ্রি জিরো’ আন্দোলনের প্রশংসা করেন।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু কর্মী হিসেবে পরিচিত আল গোর। তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গৃহীত সংস্কার কর্মসূচিকে সমর্থন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এসব তথ্য জানান।

সাক্ষাৎকালে উভয় নেতা জুলাই বিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গৃহীত সংস্কার কর্মসূচি এবং নির্বাচন ও ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সংস্কার কর্মসূচি এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সমর্থন করার কথা জানান।

অধ্যাপক ইউনূস তাকে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আঁকা গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত শিল্পকর্ম সংকলন ‘দ্য আর্ট অফ ট্রায়াম্ফ’ বইটি উপহার দেন। আল গোর শিল্পকর্ম সংকলনের বই এবং বাংলাদেশের তরুণদের বিপ্লবী চেতনাকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা মনোযোগ দিয়ে দেখেছি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বিশ্বব্যাংকের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত : বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্না বিয়ার্দে বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি বৈশ্বিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটির সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে সম্মেলনের ফাঁকে আন্না বিয়ার্দে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি প্রধান উপদেষ্টাকে বিশ্বব্যাংকের সমর্থন ব্যক্ত করেন। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এ তথ্য জানান।

এ সময় বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্না বিয়ার্দে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি আমাদের সমর্থন প্রকাশ করতে চাই। আপনারা যেকোনো সহায়তার জন্য আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন ব্যাংকটি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের প্রতি তাদের সমর্থন প্রসারিত করতে আগ্রহী। আলোচনায় তারা জুলাই বিপ্লব, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচি এবং দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি তারেক আরিফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত