যত সংঘাত তত আয়

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০৬:৫৯ এএম

পৃথিবীর ক্ষমতাধর দেশগুলোর নাম উঠলে সেখানে অবধারিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের নাম উচ্চারিত হয়। তবে সেটি নেহায়েত কোনো ঠুনকো কারণে নয়, দেশটি তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতার জন্য বিশ্ব জুড়ে হরহামেশাই ছড়ি ঘুরিয়ে থাকে কিংবা ঘোরানোর চেষ্টা করে। আর এই কথার পেছনের কারণ অনেকটাই বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র রপ্তানির তথ্য থেকে। গত বছর ২০২৪ সালে বহির্বিশ্বে রেকর্ড ৩১ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যা দেশটির অস্ত্র বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন এক মাইলফলক ছুঁয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের শীর্ষ সমরাস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর আগে কোনো বছর এত বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করেনি দেশটি। ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির হার ২৯ শতাংশ বেড়েছে। এক প্রতিবেদনে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিদায়ের এ বছরটিতে বিশ্ব জুড়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে তিনটি মার্কিন কোম্পানির যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম। এই কোম্পানিগুলো হলো লকহিড মার্টিন, জেনারেল ডায়নামিক্স এবং নর্থরোপ গ্রুমান। ব্যাপকমাত্রায় বিক্রির ফলে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে অস্থিরতা সত্ত্বেও এই তিন কোম্পানির শেয়ারের দাম বছর জুড়েই চড়া ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধের জেরে ইউরোপসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিত্রদেশ নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ফরমায়েশ দিয়েছে মার্কিন বিভিন্ন অস্ত্র উৎপাদন কোম্পানির এজেন্টদের কাছে। আর মিত্র দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট এবং রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ইস্যুতে বেশ মনোযোগী। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাকালে ট্রাম্প বলেছিলেন যে, তিনি চান যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশগুলো তাদের বার্ষিক বাজেটের ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ রাখুক। বর্তমানে এই হার ২ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় ও রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়টি গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। মিত্র ও অংশীদারদের কাছে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের যথোপযুক্ত তা নির্ধারণে রাজনৈতিক, সামাজিক, মানবাধিকার, বেসামরিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক ও সামরিকসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তুরস্কে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার এবং ইসরায়েলের কাছে ১ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার মূল্যের এফ ১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে ওয়াশিংটন। একই সময়ে রোমানিয়ায় বিক্রি হয়েছে বেশ কয়েকটি এম১ এ ২ আব্রামস ট্যাংক, যেগুলোর সম্মিলিত মূল্য ২৫০ কোটি ডলার। পেন্টাগন জানিয়েছে, ২০২৪ সালে কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ২০ হাজার ৮০ কোটি ডলারের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। আর সরকারি যোগাযোগের মাধ্যমে ২০২৪ সালে ১১ হাাজর ৭৯০ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র ও সরঞ্জাম রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৩ সালে যার পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯০ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র ক্রয়ের যেসব অর্ডার এসেছে, তা ক্রেতা দেশগুলোকে সরবরাহ করতে চলতি বছর পুরোটাই লেগে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব অর্ডারে যুদ্ধবিমান ছাড়াও রয়েছে লাখ লাখ রাউন্ড গুলি ও আর্টিলারি গোলা, হাজার হাজার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত শত সাঁজোয়া যান। কোনো দেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম কিনতে চাইলে দুটি পন্থা অবলম্বন করতে হয়। প্রথমটি সরাসরি অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা। দ্বিতীয়টি অস্ত্র ক্রয়ের ইচ্ছে প্রকাশ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করা। তবে এই লেনদেনের উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে।

এর আগে, ২০২৩ সালেও অস্ত্র বিক্রয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মার্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামরিক বিক্রয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫৭.৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২২ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ১৫৩.৬ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে সে বছর সরকারের মাধ্যমে বিক্রয় আগের বছরের ৫১.৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮০.৯ বিলিয়ন ডলারে। সুইডেনভিত্তিক স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) এর ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর বিশ্বের শীর্ষ ১০০ অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিলে অন্তত ৫৯৭ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি অস্ত্র একাই বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো। শীর্ষ ১০০ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি প্রতিষ্ঠান ছিল।

তবে অস্ত্র বিক্রয়ের ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়লে বিশ্ব জুড়ে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ত তা নিয়ে নিন্দার ঝড়ও উঠেছে বিশ্ব জুড়ে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে যেমন ঢালাওভাবে সামরিক সহায়তা প্রদান করে গেছে দেশটি, তেমনি ইসরায়েলকেও বিপুল অঙ্কের সমরাস্ত্র প্রদান করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল বাইডেন প্রশাসন। আবার অন্যদিকে মিসর ও কাতারের সঙ্গে মিলে গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনাতেও সরব উপস্থিতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। দেশটির এমন দ্বিচারিতার বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো লাগাতার প্রতিবাদ করে গেলেও তাতে কর্ণপাত করেনি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বাইডেনের প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সংস্থা প্রোপাবলিকা তাদের প্রতিবেদনে বলছে, বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তাগুলো উপেক্ষা করেছেন। ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ অনুমোদন অব্যাহত রাখেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাবেক কর্মকর্তারা বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থায়নের অভিযোগ তুলেছে।

কেউ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে, কেউ অন্যকে বা অন্য দেশের ওপর প্রভাব খাটাতে কিংবা আক্রমণ করতে অস্ত্র কেনে। আবার কেউবা প্রতিবেশীর সঙ্গে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে বা আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে অস্ত্রের মজুদ গড়ে তোলে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতগুলোকে উপেক্ষা করে দেশের স্বাভাবিক সামর্থ্যরে তুলনায় বেশি খরচ করে অস্ত্রের জন্য। আবার বিভিন্ন দেশের কলহলিপ্ত স্বাধীনতাকামী, বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসী এবং জঙ্গি গোষ্ঠীও প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করে। এসব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বে যৌক্তিক-অযৌক্তিক দুভাবেই অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের কেনাবেচা দিন দিন বাড়ছে। তবে সর্বোপরি এসব অস্ত্রের ব্যবহারে সংঘাত বাড়ছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন কোটি কোটি নিরপরাধ সাধারণ মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত