বেকার শ্রমিকরা জড়াচ্ছেন অপরাধে!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

শিল্পনগরী গাজীপুরে নানা কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পোশাক কারখানা। এতে বেকার হচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকরা বলছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর নারী শ্রমিকরা কোথাও কোথাও চাকরি পেলেও, পুরুষ শ্রমিকরা পড়ছেন বিপাকে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, চালু থাকা কোনো কারখানাতেই কর্তৃপক্ষ পুরুষ শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে না। এতে তারা বেকার দিন পার করছেন। পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, চাকরি না পেয়ে সংসার চালাতে পুরুষ শ্রমিকরা ছিনতাইসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।

জানা যায়, গত জুলাই-আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত পাঁচ মাসে গাজীপুরে ৫১টি শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৪১টি স্থায়ী এবং ১০টি কারখানা অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া আগামী মে থেকে কেয়া গ্রুপের আরও সাতটি কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার কর্মহারা শ্রমিকরা বেকার হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছেন।

বন্ধ থাকা এসব কারখানার শ্রমিকরা কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায়ই বন্ধ থাকছে মহাসড়ক। এই শ্রমিকদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

গাজীপুর শিল্প-পুলিশ ও শ্রমিকরা জানান, কাজের সুবাদে গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন জেলার লাখ লাখ মানুষ বসবাস করেন। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে নিবন্ধিত কারখানা রয়েছে ২ হাজার ১৭৬টি। এর মধ্যে তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা ১ হাজার ১৫৪টি। গত নভেম্বর মাস থেকে ৩৫টি তৈরি পোশাক কারখানা তাদের কর্মীদের বেতন দিতে পারেনি, যা কারখানার ২ শতাংশ। ডিসেম্বর মাস থেকে বেতন দেয়নি ৪৫ ভাগ কারখানা। এই মুহূর্তে গাজীপুরের ৫ শতাংশ কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ রয়েছে। ৯ শতাংশ কারখানায় ইনক্রিমেন্ট নিয়ে জটিলতা চলছে। এমন বাস্তবতায় ১ হাজার ১৫৪টি তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে ৪১টি এবং অস্থায়ীভাবে ১০টি কারখানা বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের কেউ কেউ অন্য কারখানায় চাকরি নিতে পারলেও, পুরুষ শ্রমিকরা কোথাও নিয়োগ পাচ্ছেন না। সুমন নামের এক পোশাকশ্রমিক জানান, গাজীপুর মহানগরীর নওজোর এলাকায় তিনি একটি কারখানায় চাকরি করতেন। তুচ্ছ কারণে তার চাকরি চলে যায়। চাকরির জন্য বিভিন্ন কারখানায় ঘুরলেও তার চাকরি হচ্ছে না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়ায় বসবাস করেন তিনি। দুই মাস ধরে বেকার বসে আছেন। কোথাও চাকরি হচ্ছে না। এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।

গাজীপুর মহানগরীর দক্ষিণ ভোগড়া বাসন সড়ক এলাকায় মিম ডিজাইন কারখানায় প্রায় ১৫ বছর ধরে চাকরি করেন শাহীনা বেগম নামে এক নারী শ্রমিক। তিনি বলেন, কাজ নেই অজুহাতে দুই মাস ধরে কারখানাটি বন্ধ রয়েছে। কবে কারখানাটি খোলা হবে, তা নিশ্চিত করে কিছু বলছে না কর্তৃপক্ষ। কারখানার কর্মকর্তারা দু-তিন মাসের করে বেতন পাওনা থাকলেও কর্তৃপক্ষ তাদের বেতন পরিশোধ করছে না। তারাও পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে, শ্রমিক বেকারত্বের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে কারখানা বন্ধের কারণ শ্রমিক আন্দোলনকে দায়ী করা যাবে না। কারণ বিগত দিনেও শ্রমিকরা তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, দাবি-দাওয়াসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্দোলন করেছেন। এভাবে কারখানা বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও হতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। বিগত সরকারের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িতরাই বিপাকে পড়ছেন বেশি। কারখানা মালিকদের কৃতকর্মের দায়ে শ্রমিকদের বেকার করে দেওয়া হচ্ছে।

গাজীপুর শিল্প-পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জেলায় ৫১টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি কারখানা অস্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে, তারা হয়তো যেকোনো সময় খুলে দিতে পারে। ব্যাংক সমস্যাসহ বিভিন্ন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে বলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আমরা আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ করছি।’

তিনি আরও বলেন, কর্মহীন শ্রমিকদের অনেকেই কারখানা খুলে দেওয়া ও বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায়ই বন্ধ থাকছে ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়ক। এসব শ্রমিককে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুরে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই বেড়ে গেছে। আর এসবের পেছনে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে যাওয়া কিছু লোক জড়িত রয়েছে। অনেকের স্ত্রী চাকরি করলেও নিজে কর্মহীন হয়ে স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছেন। চাকরি করে একসময় হাজার হাজার টাকা গুনলেও এখন স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হয়। নানা হতাশার কারণে তারা অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়ছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত