মুক্ত সাত কলেজ

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:১১ এএম

সাত কলেজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা কেন এই আন্দোলন করছেন, তার যৌক্তিকতা কতটুকু, তা নিয়ে কখনো কি সেই পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে? অথবা কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত? তা যে হয়নি, সেটা বোঝা গেল রবিবার। সন্ধ্যায় শুরু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি মধ্যরাতে সংঘাতে গড়িয়েছে। সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত দুপক্ষের অন্তত পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে চার প্লাটুন বিজিবি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেন এমন সংঘর্ষ? এর জন্য ফিরতে হয় একটু অতীতে।

শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নতুন অধিভুক্ত কলেজগুলো সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেছিলেন, ‘এখন  থেকে এই অধিভুক্ত কলেজগুলোর ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি প্রক্রিয়া, পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিচালিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুযায়ী বিদ্যায়তনিক কার্যক্রমও পরিচালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। হলে এ রকম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার কথা নয়। সোমবার সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ঢাবির বর্তমান প্রো-ভিসি ড. মামুন আহমেদ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয়ত, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবির প্রতি ঢাবির পক্ষ থেকে অবহেলা এবং অশোভন আচরণের কারণে আন্দোলনে নামেন। শিক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবি হচ্ছে ২০২৪-২৫ সেশন থেকেই সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিল, শ্রেণিকক্ষের ধারণক্ষমতার বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি না করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা, ভর্তি পরীক্ষায় ভুল উত্তরের জন্য নম্বর কাটতে হবে ও সাত কলেজের ভর্তি ফির স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মন্ত্রণালয় গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া নতুন অ্যাকাউন্টে ভর্তি ফি জমা রাখতে হবে।

রবিবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয়পক্ষের মধ্যে ঘণ্টাখানেক ধরে চলেছে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা। সংঘর্ষের ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নীলক্ষেত ও নিউ মার্কেট এলাকা। দফায় দফায় দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় সাংবাদিক ও পথচারীসহ অন্তত ২০ জন ঢামেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এবার সরকারি সাত কলেজের সোমবারের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। রবিবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সাত কলেজের সমস্যা ও ভর্তির আসনসংখ্যা কমানোর বিষয়ে ২১ দিন আগে প্রো-ভিসিকে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও সেটি তিনি পড়েননি। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের চেনেন না বলেই তিনি আক্রমণাত্মক ব্যবহার করেন। এরপর থেকেই মূলত তার অশোভন আচরণের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।

সেশনজট কিছুটা কমে এলেও সময়মতো পরীক্ষা, রুটিন প্রকাশ, ফলাফল না হওয়ায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে কলেজগুলোর কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর জীবন। মাঝে মাঝেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের নানা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামতে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও একটি অংশ সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের জন্য আন্দোলন করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাত কলেজের দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ ঢাবি প্রশাসন। সাত কলেজের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হলেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এখনো নানান জটিলতায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের সমন্বয়হীনতাই এর মূল কারণ। তারা যদি আন্তরিক না হয় তবে সমস্যা কীভাবে সমাধান হবে?

তবে আশার কথা, সমস্যার আপাত সমাধান হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্তি থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে সরকারি সাত কলেজ। ২০২৪-২৫ সেশন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ হচ্ছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সঙ্গে জরুরি  বৈঠকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান সরকারি সাত কলেজের অধ্যক্ষরা। একটি কথা মনে রাখা দরকার, শিক্ষার্থীদের ঐক্যে যদি ফাটল ধরে তাহলে ৫ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ধরনের সংঘর্ষ, বিভক্তি পতিত স্বৈরাচারী অপশক্তির হাতকেই শক্তিশালী করবে। বিভক্তির সুযোগে যেন স্বৈরাচারের আবাহন না হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত