দেশের ওমরাহ হজযাত্রীদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপানায় মেনিনজাইটিস টিকাদানের ব্যবস্থা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ৮০টি কেন্দ্রে এসব টিকা দিতে পারবেন হজযাত্রীরা।
এজন্য পর্যাপ্ত টিকার ব্যবস্থা করেছে দেশে মেনিনজাইটিস টিকার একমাত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কর্র্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই তারা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ১৭ হাজার টিকা সরবরাহ করেছে। আগামী মার্চের মধ্যে আরও ৪০ হাজার টিকা উৎপাদনের আশা করছেন তারা। এ ছাড়া কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এই টিকা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে এই টিকা সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। হজযাত্রীদের ব্যক্তিগতভাবে টিকা কিনতে হবে। প্রতি ডোজ টিকার খুচরা মূল্য ১ হাজার টাকা।
গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি কেন্দ্রগুলোয় টিকা নিলে যাত্রীদের পাসপোর্ট নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। হজযাত্রীরা সেখান থেকে টিকার সার্টিফিকেট ডাউনলোড করতে পারবেন এবং বিমানবন্দর কর্র্তৃপক্ষও সেটি দেখতে পাবেন।
আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে যারা ওমরাহ করতে বা ভিজিট ভিসায় সৌদি আরব যাবেন, তাদের জন্য মেনিনজাইটিসের টিকা বাধ্যতামূলক করেছে সৌদি সরকার। তবে সৌদি আরবে কাজের জন্য যাওয়া কর্মীদের এই টিকা লাগবে না। গত সপ্তাহে ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে টিকা নিতে যান সৌদি গমনেচ্ছুরা। টিকা না পেয়ে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা।
যেসব কেন্দ্রে টিকা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশের ৮০টি কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেছে। এর মধ্যে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফুলবাড়িয়ার সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, রাজারবাগের কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল ও বাংলাদেশ সচিবালয় ক্লিনিকে এই টিকা দেওয়া যাবে।
ঢাকার বাইরে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়ার ২৫০ শয্যার মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল ও দিনাজপুরের ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা দেওয়া যাবে।
এ ছাড়া ৬৪ জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় ও জেলা হাসপাতালগুলোতেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকাদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘হজযাত্রীরা ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো জায়গায় টিকা নিতে পারবেন। তবে সরকারিভাবে আমরা ৮০টি কেন্দ্র নির্দিষ্ট করেছি। এসব কেন্দ্র অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হবে। তখন এসব কেন্দ্রে টিকা নিলে অনলাইনে টিকার সার্টিফিকেট ডাউনলোড করতে পারবে। অবশ্য সৌদি সরকার সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের সার্টিফিকেট অনুমোদন দেবে, সেটা এখনো চূড়ান্ত করেনি।
বুধ-বৃহস্পতি থেকে টিকা, কিনতে হবে ব্যক্তিগতভাবে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর ডা. হালিমুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি ২৯ জানুয়ারি থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার। কারণ ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে হজে গেলে তার ১০ দিন আগে টিকা নিতে হবে। সিস্টেম ডেভেলপ করতে সময় লাগছে। আশা করছি, ২৯ জানুয়ারির মধ্যেই হয়ে যাবে। সেদিন বা তার পরদিন ৩০ জানুয়ারি থেকে টিকা দিতে পারব।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এই টিকা ব্যক্তিগতভাবে কিনতে হবে। কারণ সরকারের সরবরাহ নেই। টিকাদান কর্মসূচির জন্য আমাদের কিনতে হয়। কিন্তু ওমরাহর জন্য কোনো টিকা নেই। কারণ এটা এবারই প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার। এসব কেন্দ্রে ওমরাহ যাত্রীদের সঙ্গে করে টিকা নিয়ে যেতে হবে ও সেখানে দিতে পারবে।’
বাজারে ১৭ হাজার, মার্চে আরও ৪০ হাজার উৎপাদন : বাংলাদেশে মেনিনজাইটিস টিকা একমাত্র ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস উৎপাদন করে ও কিছু কোম্পানি বিদেশ থেকে আমদানি করে বলে জানান ইনসেপ্টা কর্র্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে ইনসেপ্টার মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি ডিপার্টমেন্টের ভ্যাকসিন সেকশনের সিনিয়র ম্যানেজার ফারহানা লাইজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে এই মুহূর্তে ১৭ হাজার টিকা আছে। ইতিমধ্যেই এসব টিকা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আমরা বাজারে ছেড়েছি। আগামী মার্চের মধ্যে আরও ৪০ হাজার টিকা উৎপাদন করতে পারব। খুচরা মূল্য ১ হাজার টাকা। এক ডোজ করে দিতে হয়।’
এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একবার টিকা নিলে সেটার মেয়াদ থাকে তিন বছর। এর মধ্যে আর টিকা নিতে হয় না। দুই বছর বয়স থেকে শুরু করে সবাই টিকা নিতে পারবেন। দুই ধরনের টিকা আছে। আমরা উৎপাদন করি এক ধরনের। তবে যেকোনো এক ধরনের টিকা নিলেই হবে।’
সংকট হবে না : বাংলাদেশে ওমরাহ হজযাত্রী অনুপাতে মেনিনজাইটিস টিকার অভাব হবে না বলে মনে করেন সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তারা।
এ ব্যাপারে ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, এই টিকা কয়েকটা কোম্পানি আমদানি করে ও ইনসেপ্টা উৎপাদন করে। সংকট হবে না। ইনসেপ্টা উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফারহানা লাইজু বলেন, ‘আনুমানিক ওমরাহ করতে প্রতিবছর দেশ থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ সৌদি আরব যান। দুই মাস ওমরাহ বন্ধ থাকে। সে হিসেবে মাসে আট হাজারের কিছু বেশি মানুষ ওমরাহ করতে যান। সে হিসেবে এখন থেকে মাসে আট হাজারের কিছু বেশি টিকা লাগবে। আশা করছি, আগামীতেও টিকার সমস্যা হবে না। কারণ এরই মধ্যে আমরা উৎপাদন করে ফেলব। টিকার বাধ্যবাধকতা এবার হঠাৎ করেই করা হয়েছে। কারও কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই আমরা উৎপাদন করতে পারব।’
এই কর্মকর্তা বলেন, এই টিকার স্থানীয় বাজার তেমন বড় না। সে হিসেবে বেসরকারি উদ্যোগে খুব কম আমদানি হয়। এখন হয়তো বাজারটা ধীরে ধীরে বড় হবে। আমদানিকারকরা টিকা আনার চেষ্টা করবে। সৌদি আরব যেহেতু বাধ্যতামূলক করেছে, সংকট হবে না।
সংশ্লিষ্টদের চিঠি অধিদপ্তরের : সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওমরাহ হজযাত্রীদের মেনিনজাইটিস টিকাদানের ব্যবস্থা করতে গত রবিবার হাসপাতাল ও সিভিল সার্জনদের চিঠি দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর আগে ওমরাহ পালন ও ভ্রমণ ভিসায় সৌদি যেতে ইচ্ছুক যাত্রীদের মেনিনজাইটিস টিকা দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে ২২ জানুয়ারি একটি চিঠি পাঠায় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে হতে যেসব যাত্রী ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব যাবেন অথবা ভিজিট ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে ওমরাহ অথবা জিয়ারত করবেন, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে মেনিনজাইটিস টিকা গ্রহণ করতে হবে। যাত্রীদের যাত্রার তারিখ থেকে কমপক্ষে ১০ দিন আগে বাধ্যতামূলকভাবে মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে হবে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভ্যাকসিন নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
চিঠিতে আরও বলা হয়, মেনিনজাইটিস প্রতিরোধক দুই ধরনের ভ্যাকসিন রয়েছে। এক ধরনের টিকার মেয়াদ তিন বছর ও আরেকটির পাঁচ বছর। সে সময় পর্যন্ত টিকার সনদ কার্যকর থাকবে। অবশ্যই ভ্যাকসিন গ্রহণের সনদটি সঙ্গে রাখতে হবে এবং ভ্যাকসিন সনদে অবশ্যই নিজের পরিচয়, ভ্যাকসিনের নাম, ধরন ও ভ্যাকসিন গ্রহণের তারিখ যথাযথভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। অন্যথায় তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
অধিদপ্তর আরও জানায়, ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় গমনকারী যাত্রীরা নিজস্ব অর্থায়নে টিকা সংগ্রহ করে নির্ধারিত সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে টিকা দিয়ে সনদ গ্রহণ করবেন। হজযাত্রীদের মতো ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় যাত্রীদের ভ্যাকসিন সনদ প্রদান এবং ওই ভ্যাকসিনের সনদ ডিজিটালভাবে এমআইএসের ‘ভ্যাক্স ইপিআই’ সিস্টেমে আপলোড করতে হবে। তবে সৌদি আরবের ওয়ার্ক ভিসার গমনেচ্ছু যাত্রীদের ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।
চিঠিতে ওমরাহ ও ভিজিট ভিসায় সৌদি আরব গমনকারী যাত্রীদের মেনিনজাইটিস টিকা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়।
মেনিনজাইটিস প্রদাহজনিত রোগ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা জানান, মেনিনজাইটিস মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের চারপাশের টিস্যুর প্রদাহজনিত সমস্যা। মেনিনজাইটিস যেকোনো বয়সী মানুষেরই হতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের কারণে মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে। রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে এবং তৎক্ষণাৎ চিকিৎসার প্রয়োজন ওতে পারে।
এই রোগের লক্ষণ জ¦র, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, আলো ও শব্দ অসহনশীলতা, খিঁচুনি ও মুখ দিয়ে শ্লেষ্মা বের হওয়া, অসংলগ্নতা, বমি বা বমিভাব। শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো হলো, জ¦র, খিটখিটে মেজাজ, খেতে অনীহা, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং ত্বকে লাল দানা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে এই সংক্রমণ ছড়ায়। এ ছাড়া আঘাত, ক্যানসার এবং ওষুধের কারণেও এ রোগের সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মেনিনজাইটিসের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম সুরক্ষাব্যবস্থা হলো এর টিকা নেওয়া।
