বর্ষার স্যাঁতসেঁতে মাটির উনুনে
আগুন যখন হাঁসের মাংসের গন্ধ ছড়ায়
মা তখন
ঘাম আর লাকড়ি দিয়ে আঁকেন আমাদের সংসার
বেশভূষায়, আদবে ও কেতায় যিনি পুরাদস্তুর নাগরিক, তাকেও দেখি ফিরে যেতে হচ্ছে সেই গ্রামে কীর্তনে, মেলা-মচ্ছবে, গাজীর গানে, মূলের দিকে, সর্বোপরি মায়ের কাছেও। গ্রামের সেই সর্বংসহা মা হেঁশেলের উনুনে বসে ঘাম আর লাকড়ি দিয়ে সংসারই আঁকছেন না কেবল, গতর খাক করে দিয়ে সুগন্ধি-বিলানো আতরের মতো নিজেকে পুড়িয়ে সন্তানের জন্য সুখও রচনা করে চলেছেন। মা এখানে সন্তানের ভবিষ্যৎ-সম্ভাবনার আশায় আপাত সুখী সংসারের প্রতিভূ বটে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্ষয়িষ্ণু গ্রামসমাজেরও প্রতিনিধিত্ব করছেন, কারণ, বর্তমান যে অবস্থা, তাতে এ কথা আজ স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে, কবিতার গ্রাম দিয়ে কবিতার শহরকে ঘিরে ফেলার ভাবনা এখন স্বপ্ন মাত্র। তাহলে এই পিছুটানের কবিতা কি কোনো অনিশ্চিত গন্তব্য সামনে রেখে কবির ব্যর্থ আয়োজন? আয়োজন এ কারণেই ব্যর্থ নয় যে, অধিকাংশ মানুষ স্বভাবত বিস্মরণশীল হলেও শেষ পর্যন্ত তা চেপে রাখা যায় না বলে বিনির্মাণকামী, আর এখানে, নর্মদা মিথুন ‘দূরের বরফদেশ’ নামের তার প্রথম বইয়ে আমাদের এতটুকু আশাবাদী করতে পেরেছেন যে, কয়েকটি কবিতায় এ রকম আর্ত কাতরতা থাকলেও, একমুখী প্রবণতাই তার শেষ কথা নয়, এতে অতিরিক্ত সম্ভাবনার কথাও আছে। ‘টোকাই’ শিরোনামের কবিতাটি পড়লে এই সত্যতা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। প্রথম পাঠেই কবিকে টোকাইদরদি মনে হবে, সেই সঙ্গে এ-ও মনে হবে যে, কবিতাটি যুগপৎ সামাজিক এবং রাজনৈতিকও কারণ, টোকাই চেয়েছিল, ‘কোনো প্রাসাদের ভেতরে থাকা শুকনো কাঠের ডাইনিং টেবিলে একসঙ্গে মুখে তুলে নেবে তোমাদের মতো ভদ্রমাপের গ্রাস’, কিন্তু পারেনি। সে চেয়েছিল, নেতাদের পক্ষের মিছিলে নাচতে নাচতে সহজেই নাগরিক হয়ে যাবে, কিন্তু সে তাও হতে পারেনি; অবশেষে সে এ কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় যে, তার পক্ষে তথাকথিত নাগরিক হওয়া সম্ভব নয়, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর’। নগরের এই বেখাপ্পা টোকাই শুধুই টোকাইই নয়, কবিচরিত্রের প্রতিনিধিও, যে কিনা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে, অনেক নিকট-দূরের স্বপ্ন দেখে সে এবং সবাইকে এমন একটা শহর উপহার দেওয়ার কথাও চিন্তা করে, যার একটা সবুজ মন থাকবে, যেখানকার পাখিদের চোখের দিকে তাকালেই মনটা ভালো হয়ে যাবে। এ ছাড়াও, নগরের ভেড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে এমনটিও ভাবে যে :
এই যে এত
ভিড় জমেছে
লোকের পিছে
অন্য লোক
নিয়ম-টিয়ম
সব ভুলে আজ
তোমার আমার
গল্প হোক।
এই ‘গল্প’ কবিতায় কেউ কেউ পূর্বসূরি কারও অনুরণন খুঁজে পেতে পারেন হয়তো, কিন্তু এ কথা স্বীকার করবেন যে, এটাই আমাদের অনেকের মনের কথা। ‘এই সময়ের শব্দতলায়’ অন্তরঙ্গ কথা হারিয়ে ফেলার মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি তো এখন আমাদের প্রতিদিনই হতে হয়।
বইয়ের এসব প্রবণতাসহ এখানে রয়েছে জর্জ ফ্লয়েড, ফাঁকা ও ফকফকে গণতন্ত্র, না নাগরিক না সংখ্যালঘু, ঘুমন্ত শহর, ধর্ষিতার চিৎকার আর পুলিশের লাঠি পেটানোর মতো সাহসী প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গও। এই প্রসঙ্গে কথা একটাই, এসব কথা
যথারূপে প্রকাশ করার জন্য ঋজু গদ্যপদ্যের লক্ষ্যভেদী ভাষাও দরকার। বিষয় যাই হোক, বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই পেলব ও গীতল ভাষায় রচিত, কিছু কবিতা তো এ সময়ের গানের সুর তাল গ্রহণের জন্য প্রস্তুতও বলা যায়, একাধিক কবিতা গীত হয়ে জনপ্রীতি পেয়েছে বলেও জানি। এক অর্থে সেটা গুণের বটে, তবে কোনো কোনো বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য তা ততটা বিষয়ানুগও নয়।
আশার কথা এই যে, ‘দূরের বরফদেশ’ নর্মদা মিথুনের প্রথম বই, আর তাতেই তিনি যে আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছেন, হয়তো দ্বিতীয় বইয়ে তার নিজের মুদ্রাচিহ্নও লক্ষ করা যাবে।
