আজ শুরু হয়েছে ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমা। তুরাগ তীরের বিশাল মাঠ পূর্ণ হয়েছে কানায় কানায়। তাবলিগের সাথিরা আপ্লুত। তাদের মধ্যে বইছে আনন্দের বন্যা। তারা অবস্থান করছে তাবলিগ জামাতের সর্ববৃহৎ সমাবেশে। দেশ-বিদেশের সাথি ভাইদের বার্ষিক মিলনস্থল এই সমাবেশ। মূলত তাবলিগের বার্ষিক কাজের হিসাব, পর্যালোচনা ও দাওয়াতি কাজের আরও বিস্তৃতি ঘটানোর লক্ষ্যেই বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করা হয়। ঢাকার উপকণ্ঠে টঙ্গীর সুবিশাল ময়দানে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা। ইজতেমায় বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশগ্রহণ করেন। ইজতেমার ময়দানের দক্ষিণ-পশ্চিমে তুরাগ নদী, উত্তরে টঙ্গী-আশুলিয়া বাইপাস সড়ক, পূর্বের কিছু অংশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং বাকি অংশে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও ইউরোপীয় দেশসহ বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে মুসল্লিরা অংশগ্রহণ করেন বিশ্ব ইজতেমায়।
আগের তুলনায় ইজতেমার মাঠকে অনেক উন্নত করা হয়েছে। মাঠের চারপাশে বেশ কিছু বহুতল বাথরুম তৈরি করা হয়েছে। ইজতেমা চলাকালীন বাঁশের খুঁটির ওপর চট লাগিয়ে মাঠে ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন জেলা থেকে আগত লোকদের জন্য জেলাভিত্তিক খিত্তা ও খুঁটি নম্বর দিয়ে ভাগ করা হয়, যাতে আগত মুসল্লিরা নিজেদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারেন। শুধু বিদেশি মেহমানদের জন্য তৈরি করা হয় টিনের চাল ও বেড়া দিয়ে আলাদা ঘর। সংযোগ দেওয়া হয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ। নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে ব্যবস্থা করা হয় বিদেশি মেহমানদের জন্য কঠোর নিরাপত্তা বলয়। স্থাপন করা হয় মাঠ জুড়ে পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন। তাবলিগের সাথি প্রকৌশলীদের দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় লোকেশন ম্যাপ। সব কাজই করেন তাবলিগের স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা।
ইজতেমায় বিশেষভাবে দ্বীনের দাওয়াত এবং ইমান-আমল সংক্রান্ত কথা বলা হয়। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) ও সাহাবিদের (রা.) কষ্ট ও ত্যাগ-তিতিক্ষার বিভিন্ন ঘটনা শোনানো হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ দ্বীনের কাজে আত্মনিয়োগে উৎসাহী হয়। এ জন্য দেখা যায়, সারা বছর মিলে যে পরিমাণ জামাত বের হয়, ইজতেমা থেকে তার অনেক বেশি জামাত আল্লাহর রাস্তায় ইমানের দাওয়াত নিয়ে বের হয়। ইজতেমা তাবলিগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই সবাইকে এখানে অংশগ্রহণ করতে বলা হয়। তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্র, উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার মাজাহির উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক হজরতজি মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভি (রহ.) এ লক্ষ্যেই তাবলিগের কাজের সূচনা করেন। ১৯১০ সালে ভারতের হরিয়ানা ও রাজস্থানের উত্তরের মেওয়াত থেকে এ কাজের সূচনা। তাবলিগের কাজের শুরুতে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) কয়েকজন মুসলমানের ওপর নিরীক্ষা চালান। তিনি দেখেন তারা একেবারেই ইসলামি জ্ঞানশূন্য। তারা কলেমা, নামাজ, রোজা থেকে শুরু করে দ্বীনের কোনো কিছুই জানে না। এরপর এমন কয়েকজনকে পুরোপুরি ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত করতে তিনি মেওয়াতে এ কাজ শুরু করেন। ১৯২০ সালে দক্ষিণ দিল্লির পশ্চিম নিজামুদ্দিন এলাকার এক মসজিদে তাবলিগের মূল কার্যক্রম গড়ে তোলেন মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। এটি বর্তমানে নিজামুদ্দিন মারকাজ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।
১৯২৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো হজ পালনে যান মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। মক্কায় তিনি তাবলিগের নতুন কর্মপদ্ধতির বিষয়ে পরিকল্পনা করেন। হজ শেষে দেশে ফিরে প্রথমে মেওয়াতে যান। গিয়ে দেখেন আগের কোনো প্রভাব নেই সাধারণ মুসলমানের মধ্যে। ওই সময় মেওয়াতের মক্তবগুলোয় সবার পক্ষে ইসলামি শিক্ষা নেওয়া সম্ভব ছিল না। তখন ধর্মপ্রচারের কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োগ করতে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন। তিনি সমাজের সাধারণ মানুষের মাঝে হাতেকলমে দ্বীন শেখানো ও ইসলামি অনুশাসনের অনুগামী করতে নতুন কর্মপদ্ধতি চালু করেন। কিছুদিনের মধ্যে দিল্লিসহ ভারতের বেশ কিছু এলাকায় তাবলিগের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৪ সালে মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার ছেলে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি (রহ.) তাবলিগের আমির নিযুক্ত হন।
১৯৪৬ সালে দিল্লি থেকে সৌদি আরব ও ব্রিটেনে তাবলিগের জামাত পাঠানো হয়। এর আগে পাকিস্তানসহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোয় তাবলিগের কাজ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর প্রচেষ্টায় মাওলানা আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, বর্তমানে ১৬৫টির বেশি দেশে তাবলিগ জামাতের প্রায় ১০ কোটি সাথি (অনুসারী) আছে। ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামুদ্দিনে বার্ষিক ইজতেমায় তাবলিগের প্রায় ২৫ হাজার সাথি যোগ দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ সালে ঢাকার কাকরাইল মসজিদে প্রথমবারের মতো ইজতেমা আয়োজিত হয়। বাংলাদেশে ইজতেমা পর্বে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, রমনা উদ্যান ও টঙ্গীর পাগাড় হয়ে বর্তমান স্থানে নিয়মিত ইজতেমা হয়ে আসছে।
আশির দশকের শুরু থেকে টঙ্গী ইজতেমায় বেশ কয়েকটি দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি যোগ দিতে থাকেন। একই সময়ে পাকিস্তানের লাহোরের কাছে রায়বেন্ড ও ভারতের ভুপালে বড় ইজতেমার আয়োজন করা হয়। এ দুই ইজতেমার চেয়ে টঙ্গীর ইজতেমায় বেশি মুসল্লি যোগ দিলে তা পরে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি পায়। টঙ্গীর ইজতেমার ব্যাপকতার কারণ হলো, ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত-পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। সেই সঙ্গে স্বল্প ব্যয়ভার, ভিসা প্রাপ্তির সহজতা, সাধারণ মুসলমানের আন্তরিকতা, অনুকূল পরিবেশ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের ইজতেমা সারা বিশ্বের তাবলিগ জামাতের অনুসারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আর সুষ্ঠুভাবে ইজতেমার আয়োজন বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে দেয় অনন্য মর্যাদা।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট
