রাতের ভয়াল মেঘনা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:৩৩ এএম

অবৈধ বালু উত্তোলন ও নৌযানে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিতে মুন্সীগঞ্জের মেঘনায় ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ডাকাত বাহিনী। একাধিক ডাকাত বাহিনীর বিচরণে রাতের মেঘনা ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। জেলা সদরে এবং গজারিয়া উপজেলার মেঘনা জুড়ে চলছে গোলাগুলি; খুনোখুনিও হচ্ছে। রাতের মেঘনায় স্পিডবোটে মহড়া দিতে গিয়ে নৌ-দুর্ঘটনায় মারা পড়ছে ডাকাত দলের সদস্যরা। রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। মেঘনার জলরাশি রক্তাক্ত হচ্ছে।

রাতের বেলায় মেঘনায় ভয়ংকর হয়ে উঠেছে নয়ন-পিয়াস, কিবরিয়া মিজি ও কানা জহিরের নেতৃত্বাধীন তিনটি ডাকাত বাহিনী। বাহিনীগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। বিতাড়িত ডাকাত দল জিতু বাহিনী মেঘনায় ফিরতে মরিয়া। আর উজ্জ্বল খালাশী বাবলার খুনের পর বাবলা বাহিনীর সদস্যরা মেঘনা-ছাড়া হয়েছে।

সর্বশেষ গত ৩০ জানুয়ারি রাতে জেলা সদরের আধারা ইউনিয়নের কালীরচর গ্রামের অদুরে মাঝ মেঘনায় দুই দল ডাকাতের গোলাগুলিতে দুজন নিহত ও একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কিবরিয়া মিজি ও জহিরুল ইসলাম ওরফে কানা জহিরের লোকজনের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- রিফাত হোসেন তুহিন (২৮) ও রাসেল ফকির (৩৩)। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আইয়ুব আলীকে (৪০) মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। তুহিনের বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। রাসেল ফকির জেলা সদরের আধারা ইউনিয়নের ভাষানচর গ্রামের কামাল ফকিরের ছেলে।

শুক্রবার (৩১ জানুয়ারি) সকালে কালীরচর গ্রামে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে গুলি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ নারী পিংকি আক্তারকে (২০) মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ডাকাত জহিরুল ইসলাম ওরফে কানা জহিরের ভাই শাহীন বেপারির নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ একটি গ্রুপ কালীরচর গ্রামের ডাকাত কিবরিয়া মিজির পক্ষের রাজু সরকারের বাড়িতে হামলা চালায়। রাজুকে না পেয়ে তার বোন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা পিংকিকে সামনে পেয়ে গুলি ছোড়ে। তার ঊরুতে গুলি লাগে। 

স্থানীয়রা জানিয়েছে, জেলা সদরের আধারা ইউনিয়নের কালীরচর ও চর আবদুল্লাহ গ্রামসংলগ্ন মেঘনায় রাতের বেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ নিতে কিবরিয়া ও কানা জহির বাহিনীর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে কালীরচর গ্রামের কাছে মেঘনায় জেগে ওঠা ভাষানচরের মাটি কাটা নিয়ে কিবরিয়া ও কানা জহির বাহিনীর সদস্যরা স্পিডবোটে ও ট্রলারে চড়ে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। মাঝ মেঘনায় গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছে স্থানীয়রা। 

মুন্সীগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিল্লাল হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনজনকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন ও একজনকে ঢামেক হাসপাতালে পাঠান। তিনি বলেন, গোলাগুলির ঘটনাটি চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে হয়েছে। এর বেশি কিছু তিনি বলতে পারবেন না।

চাঁদপুর নৌ-পুলিশের সুপার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি। তদন্ত করে দেখছি। ঘটনাটি মুন্সীগঞ্জের সীমানায় কালীরচর গ্রামসংলগ্ন মেঘনার ভাষানচরের। হতাহতরা একাধিক ডাকাতির মামলার আসামি।’

পুলিশের সূত্র মতে, কিবরিয়া মিঝি জেলা সদরের কালীরচর গ্রামের মরহুম বাতেন মিজির ছেলে। তার বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ সদর, গজারিয়া ও মতলব উত্তর থানায় হত্যা, ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তির ডজনখানেক মামলা রয়েছে। একই গ্রামের মোহাম্মদ বেপারির ছেলে জহিরুল ইসলাম ওরফে কানা জহিরের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ সদর, চাঁদপুর, গজারিয়া ও লৌহজং থানায় হত্যা এবং ডাকাতির দুই ডজন মামলা রয়েছে।

গত ১০ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে জেলার গজারিয়া উপজেলার কালীপুরা গ্রামের মেঘনার শাখা নদীতে স্পিডবোটে মহড়া দিতে গিয়ে ট্রলারের সঙ্গে সংঘর্ষে নয়ন-পিয়াস বাহিনীর চার ডাকাত নিহত হয়। তারা হচ্ছেন ওদুদ বেপারি (৩৬), বাবুল সরকার (৪৮), সাবিক (২৬) ও নাঈম (২৪)। নয়ন-পিয়াস বাহিনীর ওই সদস্যরা নৌযানে চাঁদাবাজি করতেই স্পিডবোট নিয়ে মেঘনায় নেমেছিলেন বলে জানিয়েছেন নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা।

এর আগে বালু উত্তোলনের দ্বন্দ্বের জেরে খুন হয়েছেন মেঘনার কুখ্যাত নৌ-ডাকাত বাবলা বাহিনীর প্রধান উজ্জ্বল খালাসী ওরফে বাবলা (৪২)। গত বছর ২২ অক্টোবর সকালে জেলার গজারিয়া উপজেলার মল্লিকেরচর গ্রামের একটি বাড়িতে অবস্থানকালে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন বাবলা। এ ঘটনায় গজারিয়া থানায় বাবলার মা ফরিদা বেগমের করা মামলায় গুয়াগাছিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য জমিস উদ্দিন, একই গ্রামের নয়ন বাহিনীর প্রধান নয়ন সরকার ও তার প্রধান সহযোগী পিয়াস সরকারসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।

পুলিশের সূত্রমতে, নিহত বাবলার বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, শরীয়তপুর ও নারায়ণগঞ্জ থানায় হত্যা এবং ডাকাতিসহ অন্তত ৩৭টি মামলা রয়েছে। তিনি চাঁদপুরের মতলবের মোহনপুর গ্রামের বাচ্চু খালাসীর ছেলে।

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার আলম আজাদ জানান, নয়ন বাহিনীর প্রধান নয়ন সরকার জেলার গুয়াগাছিয়া ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের বাতের সরকারের ছেলে ও তার প্রধান সহযোগী পিয়াস সরকার একই গ্রামের মাহমুদ আলীর ছেলে। ডাকাত নয়নের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জসহ নদীবেষ্টিত বিভিন্ন জেলার থানাগুলোতে ৩২টি মামলা রয়েছে। পিয়াসের বিরুদ্ধে রয়েছে ২৭টি মামলা। 

জেলা সদরের আধারা ইউনিয়নের জাজিরা গ্রামসংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরে রাতের আঁধারে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু ইলিয়াস শান্ত সরকারকে (৩৫) হত্যার অভিযোগও রয়েছে। গত বছর ১ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে বলে নিহতের পরিবার দাবি করেছে। 

তবে পুলিশ বলছে, স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের সংঘর্ষে যুবদল নেতার মৃত্যু হয়েছে। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই মামুন সরকার বাদী হয়ে আটজনের নাম উল্লেখ ও আরও ছয়-সাতজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় ডাকাত দল কিবরিয়া বাহিনীর প্রধান কিবরিয়া মিজিকে তিন নম্বর আসামি করা হয়েছে। 

মেঘনাবক্ষে অবৈধ বালু উত্তোলনে ও চাঁদাবাজিতে ডাকাত বাহিনীগুলোর মধ্যকার সাম্প্রতিক খুনোখুনি ও গোলাগুলি প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীতে নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ড রয়েছে। এটা তাদের কাজ। আমরাও তাদের সহযোগিতা করি। ডাকাত বাহিনীর সদস্যদের ধরপাকড়ে আমরা তৎপর রয়েছি।’

গজারিয়া কোস্ট গার্ডের ইনচার্জ জাবিদ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওপরের নির্দেশ ছাড়া কিছু বলতে পারব না। আমাদের মিডিয়া উইং রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে তবেই বক্তব্য দিতে পারব। সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে ওপরের মহলকে জানিয়েছি। তাদের নির্দেশ মোতাবেক কাজ করব।’

গজারিয়ায় বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে তীরবর্তী মানুষ ও ইজারাদার মুখোমুখি : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর পাড় ঘেঁষে বালু উত্তোলন করার সময় বাধা দিতে গেলে চার রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয়। ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের হামলায় নাহিদ (২০) নামে এক যুবক আহত হয়েছেন।

গতকাল সকাল ৯টার দিকে গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের বেরু মোল্লাকান্দি গ্রামসংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরে এ ঘটনা ঘটে।

চলতি বছর মেঘনা নদীর গজারিয়া উপজেলার কালীপুরা, ষোলআনী, চররমজানবেগ মৌজায় ১২৮ একর এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। বালুমহালটির ইজারা পেয়েছে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত জায়গার বাইরে গিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে সন্ধ্যার পর এবং ভোরবেলা নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের ফলে কয়েকশ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি। 

শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে বেরু মোল্লাকান্দি গ্রামসংলগ্ন নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন করার সময় এলাকাবাসীর বাধার মুখে পড়ে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজন। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে নদীর পাড়ে স্থানীয়দের জড়ো করা হয়। সে সময় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে বালুমহাল থেকে চার রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয় বলে দাবি করে স্থানীয়রা। ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় কয়েকজন ট্রলার নিয়ে বালুমহালে গেলে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের লোকজনের হামলায় নাহিদ নামে ওই যুবক আহত হন।

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির মোল্লা বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত জায়গার বাইরে এসে নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন করছিল ইজারাদার প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় লোকজন প্রথমে তাদের মৌখিকভাবে বাধা দেয় কিন্তু তারা সেটা আমলে না নিলে এলাকাবাসী একজোট হয়ে তাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তখন নদীর তীরবর্তী এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।’ 

স্থানীয় বাসিন্দা কামাল বলেন, ‘আজ সকাল ৯টায় বেরু মোল্লাকান্দি গ্রাম ঘেঁষে প্রায় ২৫-২৬টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। আমরা তাদের বাধা দিতে গেলে তারা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে এবং আমাদের লোকজনদের মারধর করে। এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে সকাল ১০টার দিকে তারা পিছু হটে।’ 
নূরজাহান নামে আরেকজন বলেন, ‘আমরা নারী-পুরুষ মিলে দেড়শ-দুইশো মানুষ তাদের বাধা দিতে গিয়েছিলাম।’

এ বিষয়ে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।

গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আনোয়ার আলম আজাদ বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল তবে আমরা ওরকম কিছু পাইনি। গুলিবর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে আমার জানা নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত