ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতবর্ষের মুক্তিসংগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তি নিজের মতো করে অংশগ্রহণ করেছে। নেতা হিসেবে যারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন তারা হলেন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮), জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯-১৯৬৪) এবং সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫)। এদের ভেতর মিল ছিল, গরমিলও ছিল; এবং প্রত্যেকেই ছিলেন স্বতন্ত্র। মিলের বড় জায়গাটা ছিল এই যে, এরা সবাই ছিলেন জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। এবং তাদের ভেতর দ্বিপক্ষীয় যে ঝগড়াটা বেধেছিল সেটা ওই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই; চারজনের দুজন গান্ধী এবং নেহরু মনে করতেন যে ভারতে জাতি একটাই, সেটা হচ্ছে ভারতীয়; মওলানা আজাদও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে কংগ্রেসপন্থিই ছিলেন; তবে তার বক্তব্য ছিল এই রকমের যে, ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় রয়েছে, কিন্তু তারা সম্প্রদায়ই বটে, জাতি নয়। প্রথম জীবনে জিন্নাহও সাম্প্রদায়িক বিভাজন মানতেন বটে, তবে সেটিকে জাতিগত বিভাজন মনে করতেন না; হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করুক এটাই তিনি চাইতেন, পরে কিছুটা গান্ধীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে এবং অনেকটা মূল কংগ্রেস নেতৃত্বের অনড় অবস্থানের দরুন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না দেখে, প্রথমে তিনি রাজনীতিতেই থাকবেন না বলে ঠিক করেন। পরে সিদ্ধান্ত বদলে মুসলমানদের জন্য চিহ্নিত স্বতন্ত্র আবাসভূমির যে দাবিটি উঠেছিল, সেই ধারার রাজনীতিতে যোগ দেন এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রধান মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তখন দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে শুধু পরস্পর বিরোধীই নয়, পরস্পরের শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
এতে সর্বাধিক সন্তুষ্টির কারণ ছিল ব্রিটিশ শাসকদেরই। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ সৃষ্টিতে তাদের সক্রিয় সমর্থন ছিল; কারণ সেটি ঘটলে স্বাধীনতার আন্দোলনে বিভাজন দেখা দেবে এবং ফলস্বরূপ আন্দোলনটি দুর্বল হয়ে গেলে ব্রিটিশের পক্ষে শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকা সহজ হবে, এই ছিল আশা। সে আশা যে অমূলক ছিল তাও নয়। ব্রিটিশ শাসকদের উদ্যোগে ভারতবর্ষের প্রথম আদমশুমারি করা হয় ১৮৭১-৭২ সালে। তাতে হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা স্বতন্ত্রভাবে দেখানো হয়েছে, যদিও ব্রিটিশদের নিজেদের দেশের আদমশুমারিতে ধর্ম-সম্প্রদায়িক ভিত্তিতে জনমানুষের বিভাজন দেখানোর রেওয়াজ ছিল না। ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস রচনার বেলাতেও ব্রিটিশের উদ্যোগেই একেবারে সূচনাতেই যুগভাগ করা হয়েছিল হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ ও ব্রিটিশ যুগ হিসেবে। এর দ্বারা বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে যে হিন্দুস্থান ছিল হিন্দুদেরই দেশ, পরে মুসলমানরা এসে রাজত্ব কায়েম করে, এবং ব্রিটিশদের আগমন ভারতবর্ষকে মুসলমানদের দুঃশাসন থেকে উদ্ধার করে দেশটিকে আধুনিক যুগে নিয়ে আসে। জাতীয়তাবাদী হওয়া সত্ত্বেও সুভাষ বসু অন্য তিন নেতার কারও মতোই ছিলেন না। প্রথমত, তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে আবেদন-নিবেদনে দেশকে স্বাধীন করা যাবে না, বড় জোর ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস (ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন) পাওয়া যাবে। পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আবশ্যক হবে সশস্ত্র সংগ্রামের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে রুশ দেশে যেভাবে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ শাসকরা যে সংকটের মধ্যে পড়েছে তাকে ব্যবহার করে ভারতবর্ষকে অনেকটা সেভাবেই স্বাধীন করা সম্ভব বলে তার ধারণা হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন বিদেশে গিয়ে ভারতীয়দের নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করে দেশকে স্বাধীন করার অভিযান পরিচালনা করা গেলে দেশের ভেতরেও একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটবে এবং ব্রিটিশ শাসকরা পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হবে।
সশস্ত্র বিপ্লবীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইংরেজ শাসনের নিকৃষ্টতম বলে চিহ্নিত ব্যক্তিদের হত্যা করে স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নেবেন ভেবেছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু (১৮৮৯-১৯০৮) এবং প্রফুল্ল চাকি (১৮৮৮-১৯০৮) ছিলেন ওই পথে অগ্রযাত্রী। পরে ব্যক্তিগত আক্রমণে কাজ হচ্ছে না দেখে সংঘবদ্ধ আক্রমণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনুশীলন ও যুগান্তর নামে গোপন দল নিজ নিজ উপায়ে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হয়। চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্য সেন (১৮৯৩-১৯২৪) গোপন বিপ্লবী দল গঠন করেন। শুরুতে সূর্য সেন কংগ্রেসের রাজনীতিতেই ছিলেন, কিন্তু গান্ধীজির অসহযোগ প্রত্যাহারে হতাশ হয়ে সশস্ত্র পথ ছাড়া উপায় নেই ভেবে গোপন দলের তরুণদের তৎপরতায় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করে এবং যুদ্ধ চালিয়ে চট্টগ্রাম শহরকে কয়েকদিনের জন্য হলেও কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। মাস্টারদা’দের আশা ছিল প্রান্তিক চট্টগ্রামে বিদ্রোহ শুরু হলে সেটা সমগ্র ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তেমনটা ঘটেনি। সূর্য সেনকে সমাজতন্ত্রী ভগৎ সিংপন্থি নয়, জাতীয়তাবাদী সুভাষপন্থিই বলতে হবে। তবে সুভাষ বসুর পরিকল্পনা ছিল আরও বড় আকারে আক্রমণ পরিচালনা করার এবং অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ঘটানোর। তিনি অনেক দূর এগিয়েছিলেন। জাপানিদের সমর্থনে তার আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতবর্ষের সীমান্ত পর্যন্ত চলে এসেছিল, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপ তাদের দখলে এসে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি ও জাপানের আত্মসমর্পণের পর আর অগ্রসর হতে পারেননি। জাপানিদের সহায়তায় ভারতবর্ষকে স্বাধীন করলে সেটা মস্ত বড় একটা ঘটনা হতো বৈকি। তার ভেতর দিয়ে নতুন পরাধীনতার সূত্রপাত ঘটত কি না সে নিয়ে সংশয় অন্যায্য নয় বটে; তবে সুভাষের অবিশ্বাস্য রকমের বীরত্বপূর্ণ অভিঘাতেই যে পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারতীয় নৌবাহিনীতে বিদ্রোহ ও অন্যান্য বাহিনীতে বিদ্রোহের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে ভারতবর্ষ জুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল যার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ধর্মঘট যুক্ত হয়ে একটি প্রায়-বৈপ্লবিক পরিস্থিতি গড়ে উঠেছিল, এটা তো ঐতিহাসিকভাবেই সত্য। সত্য এটাও যে, ব্রিটিশ শাসকদের ভারতবর্ষ ত্যাগ ত্বরান্বিত হয়েছিল কংগ্রেস বা লিগের কারণে যতটা নয়, সুভাষ বসুর কারণে তার চেয়ে বেশি; যদিও সুভাষ বসু জাতীয়তাবাদী ধারার ভেতরেই ছিলেন, তার বাইরে যেতে চাননি এবং পারেনওনি যেতে।
প্রথম প্রজন্মের তিন নেতা গান্ধী, জিন্নাহ এবং মাওলানা আজাদ রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার ওপরই জোর দিয়েছেন, নেহরু এবং সুভাষ রুশ বিপ্লব দেখেছেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন; নেহরু তো এক সময় কমিউনিস্টই হয়ে যাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীই রয়ে গেছেন, সামাজিক বিপ্লবের কথা আর ভাবেননি। সুভাষ সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, কিন্তু সে-সমাজতন্ত্র জাতীয়তাবাদকে বাদ দিয়ে নয়। এ সমাজতন্ত্র পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান যে রকমের সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন, তা থেকে খুব একটা ভিন্ন প্রকারের ছিল না। সুভাষচন্দ্র বসুর পরিচয় তাই রাষ্ট্রবিপ্লবীতেই আবদ্ধ রয়ে গেল; সমাজবিপ্লবী পর্যন্ত এগুলো না। ব্রিটিশের চোখে তিনি ‘চরমপন্থি’ ছিলেন; তবে কমিউনিস্ট বিপ্লবী অর্থে নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘বিপ্লবী’ অর্থেই। ওই রকমের চরমপন্থায় আস্থা শ্রী অরবিন্দের মধ্যেও ছিল, যা শেষ হয়েছে আশ্রমিক সাধনায় পৌঁছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সুভাষ বসুর চরমপন্থা কিন্তু ব্রিটিশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল, তার কারণ তিনি জাপানের সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন।
জাতীয়তাবাদীরা কমিউনিস্টদের কতটা ভীতির চোখে দেখে তা বোঝা গেছে ২০২৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়। নিজের সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী কমলা হ্যারিস সম্পর্কে ঘৃণার উদ্রেক করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বলেছিলেন, সবাই জানে কমলা হ্যারিস একজন মার্কসিস্ট। আসলে কমিউনিস্ট হওয়ার দরকার পড়ে না, মার্কসিস্ট হওয়াটাই যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
