রাজধানীর যানজট অসহনীয় দশায় পৌঁছেছে। যানবাহনের জটে মহাসড়ক থেকে অলিগলি সব স্থবির হয়ে পড়ে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি কোনো সরকার। এবার ঢাকা শহরের অলিগলি চওড়া করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কলাবাগান থানাধীন ভূতের গলির বিভিন্ন স্থাপনা চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। স্থাপনাগুলোর যে অংশ সড়কে পড়েছে, ১৫ দিনের মধ্যে তা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর রোড, সায়েন্সল্যাব, হাতিরপুল বাজার, বাটা সিগন্যাল, নিউ মার্কেট, পরিবাগ, শাহবাগসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে ভ‚তের গলির। এ গলি ও এর আশপাশের রাস্তাগুলো এতই সংকীর্ণ যে, কোনো কোনো জায়গায় দুটি রিকশা একসঙ্গে চলাচল করতে পারে না। সারা দিন ও সারারাত যানজটে স্থবির হয়ে থাকে এলাকাটি। যানজট ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও।
যানজট প্রকট থাকার কারণে অনেকেই এ এলাকা এড়িয়ে চলেন। কলাবাগানের বাসিন্দা আসাদুল্লাহ বলেন, ‘প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে পরিবাগ এলাকায় অফিস করতে হয়। মূল সড়কে যানজট থাকায় অনেক সময় গলির ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতাম। কিন্তু ভূতের গলি এবং আশপাশের গলিগুলো এত সংকীর্ণ যে দুটি রিকশা ঢুকলে বের হওয়ার জায়গা থাকে না। কয়েক দিন এমন ভোগান্তির শিকার হয়ে এ রাস্তায় চলাচল বাদ দিয়েছি।’
পশ্চিম রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা তৌফিক মাহমুদ বলেন, ‘ভূতের গলি এখন যানজটে ভূত হয়ে থাকে। এখানে অনেক উচ্চবিত্ত মানুষের বাস। তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও অনেক। অথচ তারা গাড়ি চলাচলের জায়গা রাখেনি। সবাই শুধু বড় বড় বিল্ডিং করেছেন।’
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) মোহা. হারুন-অর-রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউক চেয়ারম্যান এবং আমরা এলাকাটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে কিছু অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। আরও স্থাপনা চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভবনের মালিকদের নোটিস দেওয়া হচ্ছে। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। চলতি মাসের শেষে একটা চ‚ড়ান্ত ব্যবস্থার দিকে যাওয়া যাবে হয়তো।’
রাজউক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ড. ছিদ্দিকুর রহমান সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঢাকাকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ২০ ফুট রাস্তা রাখা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সেন্ট্রাল রোডের ভূতের গলি পরিদর্শন করেছি। সেখানে যতটুকু সড়ক থাকার কথা, কোথাও কোথাও তা নেই। কোথাও ৫ ফুট, কোথাও ৭ ফুট। আমরা সার্ভে করে ওই রাস্তার ওপর থাকা সব স্থাপনা চিহ্নিত করে দিয়েছি। বাড়ির মালিকদের সময় বেঁধে দিয়েছি। নির্ধারিত সময়ে স্থাপনার অবৈধ অংশ অপসারণ না করা হলে আমরাই উচ্ছেদ করব।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভূতের গলির বিল্ডিং ভেঙে প্রশস্ত করার চিন্তা অবাস্তব। পুরো এলাকা ডেভেলপড হয়ে গেছে। বড় বিল্ডিংগুলো ভাঙলে যে বায়ুদূষণ হবে, তা রোধ করা হবে কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এসব এলাকা এত ঘিঞ্জি ছিল না। ২০০৮ সালে বিধিমালা সংশোধনের আগে ২০ ফুট রাস্তার পাশে চার থেকে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল। কিন্তু বিধিমালা সংশোধনের পর বড় বড় বিল্ডিং তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে এসব এলাকায় যান ও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।’
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘অবাধে বহুতল ভবন তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে হবে। আমরা দেখছি, ড্যাপ সংশোধন করে আবার বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে আরও অনেক ভ‚তের গলি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।’
