নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছিল মাদকসেবী ও কারবারিদের আখড়া। ক্যাম্পাসের ভেতরে বা আশপাশে হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত ইয়াবা, গাঁজা, প্যাথিডিনসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য। হলের কক্ষে বসে ফোন করলেও মাদক পৌঁছে দিত কারবারিরা। সন্ধ্যা নামলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, পুকুর পাড় ও লেকসহ হলের কক্ষ ও ছাদে বসত মাদকসেবীদের আড্ডা। তবে জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতন হলে বদলে যায় পরিস্থিতি।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যান ক্যাম্পাস থেকে। তাদের ছত্রছায়ায় থাকা মাদক কারবারিরাও গা ঢাকা দেন। কিন্তু ছয় মাস যেতে না যেতেই ক্যাম্পাস ঘিরে ফের সক্রিয় হচ্ছেন মাদক কারবারিরা। আগের মতো যত্রতত্র না হলেও ক্যাম্পাসের নির্ধারিত কিছু জায়গায় মিলছে মাদকদ্রব্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগ না থাকলেও অন্য ছাত্র সংগঠনের নেতাদের ম্যানেজ করে ফের পুরোদমে মাদক কারবারের চেষ্টা করছেন কারবারিরা।
সম্প্রতি মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ইবি শাখার সমন্বয়ক এস এম সুইট বলেন, ‘ক্যাম্পাস কী পরিমাণ মাদকের স্বর্গরাজ্যে ডুবে ছিল তা জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রলীগ নেতাদের রুমগুলো তল্লাশি করে দেখতে পেয়েছি। শুনতে পাচ্ছি ফের মাদকের আখড়া হয়ে উঠছে ক্যাম্পাস। আমরা হলগুলোতে আবারও প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযান চালানোর অনুরোধ করছি। মাদকের সঙ্গে জড়িতদের আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
জানা গেছে, ছাত্রলীগের সময়ে বিশেষ কিছু চক্রের সদস্যরা কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রী হলগুলোতে মাদক প্রবেশ করিয়ে বিক্রি করতেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেও ক্যাম্পাসে মাদক প্রবেশ করাতেন তারা। ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব মাদকদ্রব্য সরবরাহ হতো। চক্রের সদস্যদের মধ্যে বহিরাগত প্রভাবশালী ব্যক্তি, ছাত্রলীগের ১০-১৫ জন নেতাকর্মী ও মাদকাসক্ত শিক্ষার্থীসহ অনেক মাদক কারবারি জড়িত ছিল। এছাড়াও ক্যাম্পাসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা, ছাত্রী, আনসার, দোকানদার ও ভ্যানচালক মাদক প্রবেশে সহায়তা ও কারবারে জড়িত ছিলেন। ফলেই ক্যাম্পাসে বসেই মাদক কিনতে পারতেন শিক্ষার্থীরা। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের কারবারে কিছুটা ভাটা পড়ে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থী বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা না থাকলেও চক্রগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। ইবি থানা ও লালন শাহ হলের পকেট গেইট সংলগ্ন এলাকা, ক্যাম্পাস সংলগ্ন পান্টি এলাকা, শেখপাড়ার গার্লস স্কুল মোড় ও বসন্তপুর এলাকা থেকে কয়েকজন কারবারি নিয়মিত মাদক সরবরাহ করছেন। তবে ইদানীং পরিচিত ক্রেতা ছাড়া মাদক বিক্রি করতে চান না তারা। মাদক কেনার জন্য ব্যবহার করতে হয় গোপন কোড। কারবারিরা ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন।
এক নবীন শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাত্রলীগের আমলে গণরুমে থাকতে আমার রুমের প্রায় ৮-১০ জনই মাদক সেবন করতেন। নেতারা যা বলতেন তারা তাই করতেন। তাই তারা দ্রুত হলে সিট পেয়ে যেতেন। এছাড়া নেতারা নবীনদের মাদক সেবনে উৎসাহ দিতেন। নতুন প্রশাসন এলেও এখনো মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহিনুজ্জামান বলেন, ‘মাদকের বিষয়ে সর্বোচ্চ অ্যাকশনে যাব। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশে কড়াকড়ি করা হবে। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘মাদক ব্যবসা নির্মূলে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দ্রুতই প্রক্টরকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হবে। আগামীর বাংলাদেশ ছাত্রদের, তাদের ক্ষতি হবে এমন কোনো কাজ হতে দেওয়া যাবে না।’
