ঢাকার সিনেমা হলের দিনকাল

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:০৮ এএম

আজকের দিনে এসেও ঢাকার সিনেমা হলের ইতিহাস রীতিমতো রূপকথার মতো। সময় বদলেছে, হলের চেহারা বদলেছে, কিন্তু সিনেমাপ্রেমটা একই রয়ে গেছে। ঢাকার অসংখ্য হল আজ উঠে গেছে শহর থেকে, মানুষের স্মৃতি থেকে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

বই থেকে সিনেমা

একটা সময় ছিল, যখন ঢাকার রাস্তায় সন্ধ্যা নামলেই সিনেমা হলের সামনে লাইট জ্বলে উঠত, টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন পড়ত, আর হলের গেট দিয়ে ঢোকার সময় দর্শকের মুখে থাকত একটাই উচ্ছ্বাস ‘আজকের সিনেমাটা জমবে।’ এক সময় ঢাকার সিনেমা হল মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। নতুন সিনেমা মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হলের সামনে লম্বা লাইন, টিকিট কাটার প্রতিযোগিতা, আর দর্শকের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর পরিবেশ। পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়াটা ছিল একটা বড় আয়োজন। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ঢাকায় ছিল ৪৪টি সিনেমা হল, আর সারা দেশে সংখ্যাটা ছিল প্রায় সাড়ে ১৩শ’। সোনালি সেই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল হলভর্তি দর্শক আর ‘হাউজ ফুল’ সাইনবোর্ডের গর্বিত উপস্থিতি। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত সিনেমা হল ছিল বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র, আর ঢাকার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এখন? সেইসব হলের বেশিরভাগই শুধুমাত্র পুরনো দিনের গল্প হয়ে রয়ে গেছে। অনেক সিনেমা হলের দরজায় তালা ঝুলছে, কিছু জায়গায় হল ভেঙে উঠেছে শপিং মল, আবার কিছু হল পরিণত হয়েছে অন্য ব্যবসার কেন্দ্রে। এক সময় যেখানে সবার মন ভরিয়ে তুলত সিনেমার রঙিন জগৎ, সেখানে এখন নীরবতা।

১৯১৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ঢাকার সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল সিনেমা হল। সিনেমাকে সবাই বলত ‘বই’। ‘বই দেখতে যাওয়া’ তখন এক বিশেষ আয়োজন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই দল বেঁধে যেতেন সিনেমা হলে। আর সিনেমা হলে ঢোকার আগে একটু মুচি-মুড়ি বা চানাচুর না খেলে যেন জমতই না।

ঢাকায় প্রথম দিকের সিনেমা হল ছিল কমলা টকিজ (পরবর্তী সময়ে প্যারাডাইস), এরপর এলো লায়ন, গ্লোব, মধুমিতা, বলাকা, শবনম, অভিসার আর কত শত নাম। তখনকার দিনে সিনেমা হল মানে ছিল এক রকম উৎসবের জায়গা একসঙ্গে সিনেমা দেখা, টানটান উত্তেজনা, আর সিনেমা শেষে নায়ক-নায়িকার অভিনয় নিয়ে বিশ্লেষণ চলত চায়ের দোকানে। কিন্তু এখন? বেশিরভাগ হলই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বা শপিং মলে রূপ নিয়েছে।

অনেক হলে এখন সিনেমা তো দূরের কথা, অন্যরকম ব্যবসা চলছে। এক সময় যেখানে হলভর্তি দর্শক ‘নায়করাজ রাজ্জাক’-এর সংলাপে হাততালি দিত, সেখানে এখন হয়তো গড়ে উঠেছে প্লাস্টিক পণ্যের দোকান বা গুদামঘর।

হারানো হলগুলোর গল্প

কেউ কি কল্পনা করতে পারে, এক সময় ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় মধুমিতা, গ্লোব, বলাকা, শবনম, মধুবন-এর মতো সিনেমা হলগুলো ছিল বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র? আজ সেগুলোর কিছু বন্ধ, কিছু অন্য ব্যবসার হাতে চলে গেছে। ঢাকার পুরনো সিনেমা হলগুলোর গল্প শুনলে মনে হয়, একেকটা যেন ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্ট। আজকের স্টার সিনেপ্লেক্স আর বসুন্ধরা সিটির চকচকে প্রেক্ষাগৃহের অনেক আগে ঢাকার সিনেমাপ্রেমীরা জমায়েত হতো এক অন্যরকম পরিবেশে।

গুলিস্তান জায়গা নাকি প্রেক্ষাগৃহ

সময়টা ১৯৪৭। দেশভাগের ধাক্কায় কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলেন চিত্রব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি। ভাবলেন, ঢাকাকে একটা মডার্ন সিনেমা হল উপহার দেবেন। ১৯৫৩ সালে হলের উদ্বোধন করলেন স্বয়ং আগা খান। নাম রাখা হলো লিবার্টি সিনেমা।

কিন্তু লিবার্টি নামটা নাকি জমছিল না। ঢাকার সিনেমা হলে একটু আভিজাত্যের ছোঁয়া চাই। অতঃপর নাম রাখা হলো গুলিস্তান, যার অর্থ ফুলের বাগান। ফুলের বাগানের খ্যাতি আরেকটু বাড়ল, যখন ১৯৫৫ সালে গুলিস্তান হলের ঠিক ওপরেই ‘নাজ’ নামে আরেকটি সিনেমা হল খুলে গেল।

গুলিস্তান যে শুধুই সিনেমা দেখার জায়গা ছিল, তা নয়। ষাটের দশকে এটা ঢাকার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। তখনকার ঢাকাবাসী বলতেন, ‘গুলিস্তানে সিনেমা না দেখে ঢাকায় থাকা বৃথা।’

কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, এই সিনেমা হলের মালিক পাকিস্তানে চলে গেলেন। এরপর হলটি ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট দায়িত্ব নিল। গুলিস্তানের সেই স্বর্ণযুগ তখনো কিছুটা টিকে ছিল, তবে ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকল সেলুলয়েডের রঙিন পর্দা।

২০০৫ সালে সিদ্ধান্ত হলো গুলিস্তান সিনেমা হল থাকবে না, এখানে হবে বিশাল শপিং কমপ্লেক্স।

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো পুরনো ভবন। নতুন দালান উঠতে উঠতে ১০ তলা পর্যন্ত পৌঁছাল, তারপর থামল। এখন সেই ভবন অর্ধেক তৈরি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের মতো।

আজকের গুলিস্তান আর সেই সিনেমার গুলিস্তান এক নয়। ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে সিনেমা হলের গৌরব, কিন্তু নামটা ঠিকই টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে। তবে গল্পটা একটু বদলে গেছে আগে ‘গুলিস্তান’ মানেই ছিল বিনোদন, এখন সেটা মানেই যানজট আর ফুটপাতের ধাক্কাধাক্কি।

ঢাকার সিনেমার দাদাবাবু

শুনে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু ঢাকার প্রথম সিনেমা হলের একটি ছিল একসময় কবরস্থান। নবাব ইউসুফ খানের এস্টেটের জায়গা এক সময় হয়ে গেল পাটের গুদাম, আর তারপর এক মাড়োয়ারি সাহেব সেটাকে বানিয়ে ফেললেন পিকচার হাউজ। ১৯১৫ সালে হারিকেন লণ্ঠনের আলোয় সিনেমা দেখানোর মাধ্যমে শুরু হয় এটির যাত্রা। ভাবুন তো, সে সময় মুভি দেখার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল। নারীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল, আর ১৯২৮ সালে বায়োস্কোপের শোতে দেখানো হতো ‘মাই ড্যাডি’ আর ‘গুলবা সানোয়ার’-এর মতো সিনেমা।

নাম বদলের মাস্টার

১৯২৪ সালে সদরঘাটের কাছে গড়ে ওঠে ঢাকার দ্বিতীয় সিনেমা হল, সিনেমা প্যালেস। কিন্তু তার নাম রাখা হয় ‘মোতিমহল’, পরে আবার বদলে হয় ‘রূপমহল’। মনে হচ্ছে, সিনেমা দেখার পাশাপাশি নাম পরিবর্তনের খেলা চলত এখানে। ১৯২৯ সালে এই হলেই দেখানো হয়েছিল ‘ডন জুয়ান’, কিন্তু কিছু বিতর্কিত দৃশ্য কেটে বাদ দিতে হয়েছিল দর্শকদের চাপের মুখে। তখনকার দিনে সিনেমা দেখাও ছিল রীতিমতো এক অ্যাডভেঞ্চার। আজকের রূপমহল আর সেই সিনেমা হলের শো পুরোপুরি বদলে গেছে। সিনেমার রাজা হয়েও রূপমহল এখন স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে। পুরনো ছবির পোস্টার আর হলের তামাম ইতিহাস কেবল বাঁধানো ফ্রেমের মধ্যে আটকে গেছে। আজকাল যদি কেউ সেখানে গিয়ে খোঁজ নেয়, তবে শোনা যায় ‘এখানে এক সময় সিনেমা হল ছিল!’

নাটক থেকে সিনেমার পর্দায়

প্রথমে ছিল থিয়েটার, পরে হয়ে গেল সিনেমা হল এমন ঘটনা ঘটে লায়ন সিনেমার ক্ষেত্রে। ১৮৮৮ সালে ইসলামপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার’ পরে হয়ে যায় ‘লায়ন সিনেমা’। এখানেই ১৯৩১ সালে উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘আলম আরা’ মুক্তি পায়। ঢাকার প্রথম সবাক সিনেমা দেখার জন্য মানুষের ঢল নেমেছিল, এখনকার ব্লকবাস্টার সিনেমার মতোই।

মুকুল হল থেকে আজাদ সিনেমা হল

জনসন রোডে এই সিনেমা হলটি প্রথমে ছিল ‘মুকুল হল’, পরে হলো ‘আজাদ সিনেমা’। এখানেই মুক্তি পেয়েছিল ঢাকার প্রথম নির্বাক সিনেমা ‘দি লাস্ট কিস’। কোনো ডায়লগ ছাড়া শুধু মিউজিক আর অভিনয়ের মাধ্যমে একটা সম্পূর্ণ গল্প বলা হচ্ছিল।

মানসী, মায়া, তাজমহল আর নাগর মহল

বংশালের মানসী সিনেমা, ওয়াইজঘাটের মায়া সিনেমা, চকবাজারের তাজমহল সিনেমা সবই এখন ইতিহাস। নাগর মহল পরে নাম বদলে হয়ে যায় চিত্রামহল, আর কোনো মতে এখনো টিকে আছে।

মার্কিন সেনাদের হল

পল্টনের মাঠে যেখানে এখন বড় বড় ভবন দাঁড়িয়ে, সেখানে একসময় ছিল ব্রিটানিয়া সিনেমা হল। কিন্তু এটি ঢাকাবাসীর জন্য ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান আর ব্রিটিশ সেনাদের জন্য বানানো হয়েছিল হলটি। সিনেমা হলে বসার চেয়ারের অবস্থাও ছিল নড়বড়ে একদম যেন অস্থায়ী বিনোদন কেন্দ্র। এখানে হলিউডের বিখ্যাত সব সিনেমা দেখানো হতো, যেমন ‘ডাবল লাইফ’, ‘সাহারা’, আর ‘হ্যামলেট’।

সিনেমা হলের দর্শক গেল কই

সিনেমা হলগুলোতে যে কারণে দর্শক ধীরে ধীরে কমে গেল সেগুলো নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হবে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশের অবনতির কথা। আর এর সঙ্গে চলে আসে দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র তৈরি না হওয়ার সংকট। এক সময় সিনেমা হল মানে ছিল পরিপাটি আসন, ঝকঝকে পর্দা, আর সুশৃঙ্খল দর্শক। পরে এর জায়গা নিল ধুলোবালি, ভাঙা চেয়ার আর বিশৃঙ্খলা। স্বাভাবিকভাবেই, দর্শকের মন উঠে গেল। আগের সিনেমাগুলো ছিল পারিবারিক, গল্পনির্ভর আর সংলাপে ভরপুর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের জায়গা নিল অতি নাটকীয়তা আর অতিরঞ্জিত অ্যাকশন। দর্শক ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল।

এছাড়াও রয়েছে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের দাপট। ঘরে বসেই যদি হাজারো সিনেমা দেখা যায়, তাহলে আর হলে যাওয়ার ঝামেলা কে নেয়? ইউটিউব, নেটফ্লিক্স আর স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে সিনেমা হল যেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারল না।

আর রয়েছে শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্সের আগ্রাসন। পুরনো সিনেমা হল যেখানে ধুলো জমিয়ে বসে রইল, সেখানে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের মন জয় করে নিল। এসি-যুক্ত আরামদায়ক পরিবেশ, উন্নত প্রযুক্তির পর্দা আর নিখুঁত শব্দব্যবস্থা মানুষের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে উঠে এলো।

তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি ধীরে ধীরে নতুনভাবে সিনেমা হলের প্রাণ ফিরিয়ে আনছে। নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক পরিবেশ, আর নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হয়তো একদিন ঢাকার সিনেমা হলগুলোর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবে। একটা সময় ছিল যখন সিনেমা মানেই ছিল বড় পর্দার অভিজ্ঞতা। সময় বদলেছে, দর্শকের পছন্দ বদলেছে, কিন্তু ভালো গল্প আর সিনেমার আকর্ষণ কখনো হারিয়ে যায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত