রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে আমলাতন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৪৮ এএম

বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রকৃত অর্থে রাজনীতিবিদদের অংশগ্রহণ যে হারে কমছে, ঠিক একই হারে বাড়ছে আমলাদের কর্র্তৃত্ব, আধিপত্য ও অংশগ্রহণ। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, রাজনীতি আর রাজনীতির জায়গায় নেই। পাকিস্তানবিরুদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনীতি ছিল স্বাধিকার অর্জনের। যা শেষ পর্যন্ত এই জনপদের মানুষের স্বাধীনতা তথা মুক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করে। ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, দেশটি স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র হলেও, এই রাষ্ট্রটি কীভাবে পরিচালিত হবে, কারা পরিচালনা করবেন, পরিচালনার ধরন ও প্রকৃতি কেমন হবে সে নিয়ে তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট চিন্তন বা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছিল না মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের দাবিদার রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। সংগতকারণেই নতুন রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোতে অনেকাংশেই প্রতিস্থাপন করতে হয় পূর্বতন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সব আইনকানুন। এমনকি প্রশাসনিক কাঠামোতেও বহাল রাখা হয়, ঔপনিবেশিক ধাঁচের আমলাতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থা ও শাসনাচার। হুবহু থেকে যায় সেই পুলিশ বাহিনী, সেই সমর ব্যবস্থা!

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের প্রশাসনিক কাঠামোয় আমলাদের অবস্থান : মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের গোটা প্রেক্ষাপটটিকে বিশ্লেষণ করলে মোটা দাগে এ কথা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ। যাতে দলমত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে হয়ে ওঠে প্রতিরোধযুদ্ধে। পরে ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সেটি একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ নেয়। গঠন করা হয় প্রবাসী সরকার। যাতে পরিষ্কারভাবেই অস্বীকার করা হয়, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্য সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতৃত্ব। তদস্থলে সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের (যাদের পাকিস্তানের মানুষ অখন্ড পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন এবং সে মতো রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে নির্বাচিত করেছিলেন) গঠন করা হয় মন্ত্রিসভা। যুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয় ওয়ার কমান্ড। যার প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে গঠিত হয় মুক্তিফৌজ, মুক্তিবাহিনী, গণবাহিনী এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (যা পরে মুজিব বাহিনী নামে সমধিক পরিচিতি পায়) নামের সহায়ক বাহিনী। একইভাবে সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে গঠন করা হয় সিভিল বা বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো। এতেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের বাঙালি কর্মীদের নিয়োজন করা হয়। এভাবেই নিপীড়ক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর জনপ্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার শুরুতেই সংহত অবস্থান তৈরি হয়ে যায় পূর্বতন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের পরিচালন সংস্থাগুলো। তবে এ কথা মানতেই হবে যে, প্রবাসী সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোতে খুব অল্পসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় লেখক ও সাংবাদিক অরুণ ভট্টাচার্য তার ‘ডেটলাইন মুজিবনগর’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘‘His (Mujib’s) is a government not formed through revolution but through a war in which 90 percent of the bureaucrats did not take part at all.

মুক্তিযুদ্ধকালীন আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ : আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে প্রবাসী সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রণালয় গঠিত হলেও সারাদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসেই গঠন করা হয় আঞ্চলিক প্রশাসনিক পরিষদ। ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাক্ষরিত সাধারণ প্রশাসন বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি আদেশ জারি করেন। যাতে আঞ্চলিক পরিষদের কাজ, দায়িত্ব, জনবল কাঠামোর ধরন ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রয়োজন ও সামর্থ্য বিবেচনায় প্রথম পাঁচটি, ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা নয়টি এবং সবশেষ তা ১১টিতে উন্নীত করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচিত (সত্তরের নির্বাচনে) এমএনএ/এমপিএদের এবং অন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এসব পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই পরিষদকে প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার জন্য একজন করে আঞ্চলিক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সেই সঙ্গে নিয়োজন করা হয় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা। বলা বাহুল্য, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান আমলাতন্ত্রের বেশিরভাগ বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবাসী সরকারের যোগ না দেওয়ায় এসব আঞ্চলিক পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিরুদ্ধ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা ট্রায়াল অ্যান্ড এরর মেনে নিয়েই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব পরিষদের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। বিশেষ করে মহকুমা প্রশাসনে তেমন কোনো সরকারি কর্মকর্তা না থাকায় সেসব জায়গায় শিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা নিজ উদ্যোগে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। গঠন করেন প্রশাসনিক পুনর্গঠন কাউন্সিল। এসব কাউন্সিল গঠন করা হয়, নভেম্বরের শুরুর দিকে মুক্তাঞ্চলগুলোতে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রশাসনে আমলাদের বেশিরভাগ সদস্যের অংশ না নেওয়া প্রসঙ্গে কাবেদুল ইসলাম তার ‘মুক্তিযুদ্ধে সিএসপি ও ইপিসিএস অফিসারদের ভূমিকা’ গ্রন্থে লিখেছেন,... একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতৃবর্গ ও কর্মিবৃন্দ, সমাজের আরও সব শ্রেণিবর্গের মানুষের পক্ষে প্রাণ বাঁচানো যতটা সহজসাধ্য অন্যকথায় তাদের নিজস্ব আবাসভূমি-গৃহস্থালি ছেড়ে অন্যত্র আপাত নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়া যতটা বাধা-বন্ধনহীন ছিল (দলে দলে তারা সেটাই করেছিলেন সেদিন), কিন্তু প্রতিষ্ঠিত আমলাতন্ত্রের সদস্য তথা সরকারি যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে তা করা মোটেও সহজতর ছিল না, তা মানতেই হবে। এক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল, যা তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তহীনতায় নিপতিত করেছিল, তা হলো তাদের প্রশাসনিক ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’ অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক উন্নত অবস্থা ও অবস্থান। সত্যি কথা বলতে, সিএসপি-ইপিসিএসদের বড় অংশই সেদিন, ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন, সার্বভৌম দেশটির জন্মমুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি ও সঠিক, সবচেয়ে কঠিন ও দুঃসাহসী সিদ্ধান্তটি নিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যে জন্য স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে তাদের বিভিন্ন মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা গেছে। তবে তাদের এমনিতর প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান থেকে মুক্ত হতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি।

পুনঃস্থাপিত হলো পাকিস্তান শাসনকাঠামো : প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে সরকার কাঠামোয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ও প্রায়োগিক বাস্তবতা দৃশ্যমান থাকলেও তা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার পর অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টে দেন সরকারের ধরন। ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই সাময়িক সাংবিধানিক আদেশ জারি করেন শেখ মুজিবুর রহমান। যাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। মন্ত্রিসভার হাতেই থাকবে রাষ্ট্র পরিচালনার সব ও সর্বময় ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান। এভাবেই স্বাধীনতার মাত্র এক মাসের মাথায় দেশের শাসনকাঠামোয় প্রথম দফা বদল ঘটে। ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। শেখ মুজিব সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধাদের জায়গায় নিয়োজিত হতে থাকে পাকিস্তান আমলাতন্ত্রে কর্মরত সিএসপি ও ইপিসিএসরা। প্রসঙ্গত, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মাথায় কিউবা সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। এ সময় কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো নতুন সরকারি প্রশাসনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়োজন না করে সাবেক আমলাদেরকেই পুনর্বহালের কারণ জানতে চাইলে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, এত দক্ষ লোক কোথায় মিলবে? দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন প্রশাসনের প্রথম বছরেই সাধারণের কাঁধে চেপে বসে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের জনবিরুদ্ধ সব বিধিবিধান। পাকিস্তান আমলের প্রায় সব আইনকানুন পুনর্বহাল করা হয় খোদ নতুন শাসনতন্ত্রে (দেখুন : সংবিধানের বিবিধ অংশ, যেখানে বলা হয়েছে এই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হইলে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের অব্যবহিত আগের সকল আইন পুনর্বহাল করা হইল)। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর রাষ্ট্রনৈতিক নানা লুপহোলের সুযোগ নিয়ে যথেচ্ছ হয়ে ওঠে দেশীয় উঠতি দুর্বৃত্ত পুঁজির বিকাশন। পাকিস্তানি ধাঁচের প্রশাসনিক কাঠামোয় এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে আর্থ-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ। সঙ্গে শাপে বর হয়, দীর্ঘ সময়ের সামরিক ও সেনাছদ্মাবরণে বেসামরিক শাসন। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের ছাপিয়ে যায় সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র।

নব্বই-পরবর্তী কথিত গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাতেও বদলাল না কিছুই : দীর্ঘ ৯ বছরের সেনাশাসনবিরুদ্ধ জনআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেয় স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার। তিন জোটের রূপরেখায় ভর করে  রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে একসময়ের সেনাশাসনের উত্তরাধিকার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাষ্ট্রসংশ্লিষ্টদের দাবি মতো বাংলাদেশ প্রবেশ করে গণতন্ত্রের নবযাত্রায়। কিন্তু বিন্দুমাত্র বদল হয়নি আমলাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যগত কাঠামোর। উপরন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক সরকারের ব্যর্থতায় জন্ম নেয় তত্ত্বাবধায়ক নামের ভোটসরকার। যার গাঠনিক পথ-পদ্ধতির গোটাটাই আমলানির্ভর। মুখ্যত সাবেক আমলাদের নিয়েই গঠিত হতে থাকে এই ভোটসরকার। নির্বাচন নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার মধ্য দিয়ে আমলাতন্ত্র প্রমাণ করে দেয় রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা অধিকতর যোগ্য ও নিরপেক্ষ। রাজনীতিবিদরা নয়। আর জনসাধারণও আস্থা হারাতে থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর।

ওয়ান-ইলেভেনে আরও সংহত হলো আমলাতন্ত্র : ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পারস্পরিক বিরুদ্ধতায় দুর্বৃত্তায়নের চূড়ান্ত মাত্রা লাভ করে রাষ্ট্রযন্ত্র। নিত্যতা পায় রাজনৈতিক সহিংসতা। সাধারণের মধ্যে প্রোথিত হতে থাকে বিরাজনীতিকরণের জনবিরুদ্ধ সব প্রয়াস। সেই সুযোগে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয় সেনাসমর্থিত আরেক আমলাতান্ত্রিক সরকার। যাদের লক্ষ্য ছিল, রাজনীতিকে মাইনাস করে মুখ্যত আমলাদের নেতৃত্ব ও কর্র্তৃত্বে এক ধরনের নাগরিক সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু দুর্বৃত্ত ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত আবারও রাষ্ট্রের কর্র্তৃত্ব ফিরে আসে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। তবে এরই ফাঁকে প্রায় দুই বছরের শাসন সময়ে নিজেদের আরও সংহত ও অপরিহার্য করে তোলে আমলারা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে এলেও আগের মতোই থেকে যায় সুসংহত আমলানির্ভর রাষ্ট্রকাঠামো।

রাজনীতি নয় আমলাতন্ত্রই সব কথা : শুধুই রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার অভিলিপ্সা থেকে একাকার করে ফেলা হয় ক্ষমতাসীন দল ও সরকার ব্যবস্থাকে। গেল পনেরো বছরের শাসনসময়ে দল ও সরকারের পার্থক্য করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ে। দুর্বৃত্ত ব্যবসায়িক গোষ্ঠী আর অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের অন্তর্ভুক্তিতে রাজনীতি হয়ে পড়ে জনবিরুদ্ধ। হারিয়ে ফেলে নিজের জনসম্পৃক্ততা। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন এমনিতর রাজনীতির কারণে চূড়ান্ত মাত্রা পায় আর্থিক দুর্বৃত্তায়ন। যাতে সব থেকে বড় সহযোগী শক্তি হয়ে ওঠে আমলারা। বিশেষ করে গেল তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে প্রায় বিনা ভোটে জয়ী করানোয় পুলিশসহ বেসামরিক আমলাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এমনিভাবে পরপর তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকারি ভোটে জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে জনসম্পর্কহীন একটি সরকারি রাজনৈতিক দলে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। জনতোষণ নয়, বরং আমলা আর দুর্বৃত্ত ধনিক শ্রেণিকে বাড়তি পাইয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি। পরিসংখ্যান বলছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন গেল পনেরো বছরের জনবিরুদ্ধ সরকার ও রাষ্ট্রকে শুধু আমলাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাবদ খরচ করতে হয়েছে মোট রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশ। দুর্বৃত্ত ধনিক গোষ্ঠীর লোকেরা সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছায়াতলে শুধু রাজনীতিকেই জনবিরুদ্ধ করেনি। দেশের বাইরে পাচার করেছে লাখ লাখ কোটি টাকা। জনগণকে করেছে ঋণগ্রস্ত। অকার্যকর করা হয়েছে রাষ্ট্রের সব সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে। পরিশেষে বলতে হয়, স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিটা আর অবশিষ্ট নেই। আমলাতন্ত্রই সব কথার শেষ কথা!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত