ক্রিকেটপ্রেমীদের রোমাঞ্চের দিন আজ

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৫:০১ এএম

২০১৩ সালের ৬ জানুয়ারি দিল্লির ময়দানে শেষবারের মতো দ্বিপাক্ষিক সিরিজের ম্যাচে পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছিল দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান। সেই সাতচল্লিশে স্বতন্ত্র সত্তা হয়ে পথচলা শুরুর পর থেকে কখনোই রাজনৈতিক সুবাতাস বয়ে যায়নি দুই দেশের মধ্য দিয়ে। যতটুকু সৌহার্দ্য নিজেদের তারা দেখিয়েছে তা এই খেলার মাঠেই। সেটিও শেষ হয়ে যায় দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ নিয়ে বিশ্বের তাবৎ ক্রিকেটপ্রেমীদের উত্তেজনাও এসে নিবদ্ধ হয় কেবলমাত্র আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে। হাইব্রিড মডেলের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ম্যাচ দিয়ে আজ দুবাইয়ে আরও একবার সেই রোমাঞ্চের সাক্ষী হতে চলেছে ক্রিকেটবিশ্ব।

টুর্নামেন্টটি যখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, তখন আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর থাকার কথা পাকিস্তানের। ৮ বছর আগের সবশেষ আসরের ফাইনালে এই ভারতকে বিধ্বস্ত করেই প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল পাকিস্তান। সেই লড়াইকে পুঁজি করেই আজ ফের ভারতের মোকাবিলা করতে নামবে পাকিস্তান। তবে প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৬০ রানে হারের ক্ষত নিয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানের আসরে টিকে থাকার লড়াই। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬ উইকেটের জয়ের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ম্যাচটি ভারতের সেমিফাইনাল মঞ্চে পা দিয়ে রাখার উপলক্ষ।

শেষবার দুদল নিজেদের মুখোমুখি হয়েছিল আহমেদাবাদে, ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে রীতিমতো পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করেছিল ভারত। অবশ্য এই ধারা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট লড়াইয়ে ১৯৮৭ বিশ্বকাপ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেবার পাকিস্তান ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে তারা ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়। মজার বিষয় হলো সেমিফাইনালের আগে লাহোর স্টেডিয়ামে পাকিস্তানি দর্শকরা গাইছিল আর ডি বর্মণের বিখ্যাত গান ‘আ দেখেন জারা, কিসমে কিতনা হ্যায় দম’ একপ্রকার ভারতকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া। কিন্তু দিনশেষে সেই গানই যেন তাদের কপাল পোড়াল। সেদিনের পর থেকে পাকিস্তান বিশ্বকাপে ভারতের সামনে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

সেই সময় পাকিস্তান ছিল ভারতীয়দের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ১৯৮২ এশিয়ান গেমসে হকি ফাইনালে ভারতকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান। ক্রিকেটেও তারা দাপট দেখাচ্ছিল। ১৯৮৬ সালে শারজায় জাভেদ মিয়াঁদাদ শেষ বলে ছক্কা মেরে ভারতীয় সমর্থকদের দুঃস্বপ্ন উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর শুরু হলো পতনের গল্প। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ভারত প্রথমবার পাকিস্তানের সেই ত্রাসকে দূর করল। ২০০৩ সালে শচিন টেন্ডুলকারের বিধ্বংসী ইনিংস রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস শোয়েব আখতারকে দিশেহারা করেছিল। এরপর থেকে বারবার বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ে স্ক্রিপ্ট একটাই পাকিস্তান হারবে, শুধু কখন এবং কীভাবে, সেটাই দেখার বিষয়। মাঝে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনাল ও ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের ম্যাচদুটো ছিল পাকিস্তানের আনন্দের উপলক্ষ। এছাড়া বাকি মোকাবিলাগুলোতে পাকিস্তানের অবস্থা সেই তথৈবচ। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে ভারতের সহ-অধিনায়ক শুবমান গিলকে ভারত-পাকিস্তান রোমাঞ্চ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ছোড়া হলে তার নির্বিষ জবাবও যেন এই বিষয়টিকেই মনে করিয়ে দেয়।

এই ম্যাচ নিয়ে শুবমান জানান, ‘সত্যি বলতে তাতে আমাদের জন্য কিছুই বদলায় না। আমরা প্রতিটি ম্যাচ জেতার জন্য খেলতে নামি, এটিও তেমন। অন্য সব ম্যাচের জন্য আমরা যেভাবে নিজেদের তৈরি করি, এই ম্যাচটির জন্যও আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।’ অথচ মুখোমুখি লড়াইয়ে এ দুদলের পরিসংখ্যানে এখনো ঢের এগিয়ে পাকিস্তান। দুদলের ১৩৫ বারের মোকাবিলায় পাকিস্তান ম্যাচ জিতেছে ৭৩টি, আর ভারত ৫৭টি। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলা ৭৭ ম্যাচের মধ্যে ভারতের ৩৪ জয়ের বিপরীতে পাকিস্তানের জয় ৪০টি ম্যাচে। দুবাইয়ে পাকিস্তান পিছিয়ে থাকবে আরেকটি জায়গায়। সন্ধ্যার পর শিশির না থাকলে দুবাইয়ের স্লো উইকেটে ব্যাটিং করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকানো শুবমান স্রেফ বলেই দিলেন, ‘মাঝের ওভারগুলোতে যারা যত বেশি দৌড়ে রান নিতে পারবে, তাদের জেতার সম্ভাবনা থাকবে তত বেশি।’ শুবমানের দৃষ্টিতে, ‘২৮০ থেকে ৩০০ রান এমন উইকেটে ভালো সংগ্রহ। তবে উইকেট ভিন্ন আচরণ করলে আমরা ৩৫০, ৩৬০ রান করতে চাইব। নিশ্চিতভাবেই আমরা আক্রমণাত্মক ও ইতিবাচক ক্রিকেট খেলব।’ দুবাইয়ে দুবার ভারতকে হারানোর সাক্ষী পুঁজি করে পাকিস্তানি পেসার হারিস রউফ রয়েছেন নির্ভার, ‘এই উইকেটে আমরা ভারতকে দুবার হারিয়েছি, আমরা চেষ্টা করব যেভাবে খেলে জিতেছিলাম সেভাবেই খেলতে। আমাদের ওপর কোনো চাপ নেই, সবাই রিল্যাক্সড এবং জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।’ তবে অতীত ঐতিহ্য যাই বলুক না কেন দিনশেষে বিজয়ীর হাসি কারা হাসবেন তা ঠিক হবে আজকের মাঠের লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত