পিলখানা হত্যাযজ্ঞের এরই মধ্যে পেরিয়েছে ১৬ বছর। দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসে (বিডিআর) (বর্তমান নাম বিজিবি) বিদ্রোহের নামে বিপুলসংখ্যক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলার বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি এখনো। উদঘাটিত হয়নি ‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ এবং কারা ছিলেন দেশ কাঁপানো সেই ঘটনার নেপথ্যের ‘কুশীলব’। হত্যাকাণ্ডের মামলায় অধস্তন আদালতের রায় হয় ১১ বছরের বেশি সময় আগে। আর হাইকোর্টের রায় হয় ৮ বছর আগে। কিন্তু বিচারের প্রতীক্ষা আজও শেষ হয়নি স্বজন হারানো ভুক্তভোগীদের। অন্যদিকে একই ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে হওয়া মামলার বিচারকাজ নিকট ভবিষ্যতে যে নিষ্পত্তি হবে- এমন সম্ভাবনারও ইঙ্গিত নেই। বিস্ফোরক মামলায় ১ হাজার ৩০০ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে মাত্র ২৭৫ সাক্ষীর।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের নামে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। যা দেশ-বিদেশে বিস্তর আলোচনার জন্ম দেয়। এ ঘটনার নেপথ্যে কারা এবং কী কারণে চৌকস সেনাদের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো, সে প্রশ্নের মীমাংসার দাবি উঠছে বছরের পর বছর ধরে।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তসহ ঘটনার নেপথ্যে থাকা দায়ীদের চিহ্নিতের দাবি ওঠে হত্যার শিকার সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন মহল থেকে। এবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সে দাবি পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস। গত রবিবার ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে পরিপত্র জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর গত বছর ২৪ ডিসেম্বর পিলখানা হত্যাকাণ্ডের স্বরূপ উদঘাটন, ষড়যন্ত্রকারী, ইন্ধনদাতা এবং ঘটনাসংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি অপরাধী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই কমিশন ইতিমধ্যে শহীদ পরিবারের সদস্য, সাবেক বিডিআরের সেনা কর্মকর্তা সদস্যসহ ৩৭ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে।
সাত সদস্যের এ কমিশনের প্রধান বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক আ ল ম ফজলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিবেদন দিতে নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে এক মাস চলে গেছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন দিতে চেষ্টা করব।’
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা সিক্রেট (গোপনীয়), এখন বলা যাবে না।’
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাসহ ৫৮ জনকে অভিযুক্ত করে গত বছর ১৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় অভিযোগ জমা দেন ওই ঘটনায় শহীদ সেনা পরিবারের কয়েকজন সদস্য।
হত্যা মামলায় ৮ বছর ধরে আপিল শুনানির অপেক্ষা
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হওয়া হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের আলাদা দুই মামলায় অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) আসামি করা হয় ৮২৯ জনকে। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার অধস্তন আদালত ১৫২ জনকে প্রাণদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ১৬০ জনের। এ ছাড়া ২৫৬ আসামিকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয় আদালত।
অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। হত্যা মামলায় অধস্তন আদালতের এ রায়ের পর হাইকোর্টে ফাঁসির আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল, জেল আপিল এবং অপর্যাপ্ত সাজার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল নিষ্পত্তি হয় ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি। দুদিনের রায়ে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ অধস্তন আদালতে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ১৩৯ জনের সাজা বহাল রাখে। ৮ জনের সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন করা হয়। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৫ জনকে খালাস দেওয়া হয়। আর অধস্তন আদালতে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখে হাইকোর্ট। অধস্তন আদালতে যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ১৪ জনকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। অন্যদিকে ৬৯ জনের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন সাজা দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টে ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন সাজার রায় হয়। রায়ে খালাস পান ২৮৩ জন।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ ঘটনায় ইন্ধনদাতা গোষ্ঠী বিডিআরের দণ্ডিত সদস্যদের বাইরে কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহলের সুবিধালাভের সুযোগ ছিল কি না? যদি থাকে তাহলে তারা কারা— এমন মন্তব্য করে ‘ঘটনার পেছনের ঘটনা’ উদঘাটন করে প্রকৃত স্বার্থান্বেষী মহলের চেহারা উন্মোচনে কমিশন গঠনের তাগিদ দেন হাইকোর্ট।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির সাজা পাওয়া ৬৩ জনের পক্ষে আপিল বিভাগে ৩৫টি আপিল করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ১৩২ জনের পক্ষে ২৯টি আপিল করা হয়। অন্যদিকে হাইকোর্টে খালাস পাওয়া এবং এবং মৃত্যুদণ্ড থেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে এমন ৮৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ২০টি আপিল দায়ের করে। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আরও আসামির পক্ষে আপিল ও জেল আপিল হলেও সংখ্যা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর তারা আপিল শুনানির উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
তিনি বলেন, ‘এখন সবকিছুই নির্ভর করবে কমিশনের রিপোর্টের ওপর। রিপোর্টে যদি নতুন কোনো আসামির নাম আসে তাহলে তো পুনঃতদন্তের প্রয়োজন হবে এবং তদন্ত শেষে এখন যারা আসামি আছেন তাদের কেউ যদি বাদ পড়ে, নতুন কোনো আসামিকে যদি সংযোজন করতে হয় করবে। মোট কথা হলো একটা গ্রহণযোগ্য তদন্ত ও বিচার যাতে হয় এটিই এখন আমাদের প্রত্যাশা।’
সাক্ষ্য চলছে বিস্ফোরক মামলায়
বিস্ফোরক মামলায় ২০১০ সালের ২৭ জুন অভিযোগ গঠন করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত। যাতে আসামি করা হয় ৮২৯ জনকে। অভিযোগপত্রে ১ হাজার ৩৫৭ জনকে সাক্ষী করা হয়। মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল রাজধানীর বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে। গত জানুয়ারির শুরুর দিকে সেখানে বিচারকাজ বন্ধ চেয়ে আন্দোলন করেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে ৮ জানুয়ারি ওই আদালতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পরে সেখান থেকে সরিয়ে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে বিচারকাজ চলছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ মামলায় ২৮৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ হবে আগামী ১৩ মার্চ।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি বোরহান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১ হাজার ৩০০-এর বেশি সাক্ষীর সবার সাক্ষ্যগ্রহণ হয়তো সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের সিদ্ধান্ত হতে পারে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং মামলার সবশেষ ধাপ যুক্তি-তর্কের শুনানি শেষ হলে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসবে।’
এসব প্রক্রিয়া কতদিনে শেষ হতে পারে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করব দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য।’
জামিন আবেদন কারাবন্দি ৪৬২ আসামির
হত্যা মামলায় আড়াইশর বেশি আসামি খালাস পেলেও একই সঙ্গে বিস্ফোরক মামলারও আসামি হওয়ায় তাদের কারাগারেই থাকতে হয়। তবে বিস্ফোরক মামলায় গত ১৯ জানুয়ারি ১৭৮ আসামি জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন। এখন বিস্ফোরক মামলায় আসামি আছেন ৭৫৮ জন। তার মধ্যে ১৭৮ জন ইতিমধ্যে জামিনে মুক্তি পাওয়ায় এ মামলায় কারাগারে থাকা আসামির সংখ্যা ৫৮০ জন। মোট ৮২৩ আসামির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৫০ জনের বেশি আসামি মারা গেছেন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫৮০ জনের মধ্যে ৪৬২ জন ইতিমধ্যে জামিনের আবেদন করেছেন, যাদের মধ্যে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিও রয়েছেন। আগামী ১৩ মার্চ তাদের জামিন আবেদনের ওপর ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুনানি হবে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. বোরহান উদ্দিন।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা কারাগারে আছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ আসামি বিস্ফোরক মামলায় জামিন চেয়েছেন। এদের মধ্যে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিও আছেন। পরবর্তী ধার্য তারিখে (১৩ মার্চ) জামিনের আবেদনের ওপর শুনানি হবে।’
দিবস পালনে আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তি
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার প্রতি বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ওই তারিখকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ (সরকারি ছুটি ব্যতীত) হিসেবে পালনের নিমিত্তে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস পালনসংক্রান্ত পরিপত্রের ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক দিবসটি যথাযথভাবে প্রতিপালনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।