ওয়াসি আহমেদের ঝাঁপতাল

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৪২ এএম

জাগলারি

ফার্স্ট পারসন ন্যারেটিভে আপনার অভিজ্ঞতার বর্ণনা ভয়ংকর। যুদ্ধ, সৈন্যদের নির্যাতন, শরণার্থী ক্যাম্পে মানুষের কষ্ট কাছে থেকে দেখেছেন বলেই আপনার লেখা এত টাচিং। হবে না কেন, নিজের চোখে দেখা।

নিজের চোখে দেখা কে বলল?

তা হলে...

বানিয়ে লেখা।

তার মানে মিথ্যা।

না।

না? ইতিহাস যারা লেখেন তারা বানিয়ে লেখেন না।

ইতিহাস কোথায়! আমি ফিকশন লিখেছি, উপন্যাস।

ফিকশন বানিয়ে লিখতে হয়, তাই তো মিথ্যা।

বানিয়ে লিখলে মিথ্যা কে বলল?

ইতিহাসে সত্য ঘটনা থাকে।

শুধু ঘটনা।

ঘটনা বাদে আর কী থাকল?

যন্ত্রণা। শ্বাসকষ্টের মতো ঘুরে ঘুরে ঘূর্ণাবর্তে রূপ নিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলে। যে কারণে আমার লেখাকে টাচিং বলছেন।

ইতিহাস টাচিং হয় না?

না।

কেন?

শ্বাসকষ্টের ঘূর্ণাবর্ত হয়ে ওঠার কার্যকারণ খুঁজে পায় না বলে। আর ...

আর?

তাই ফিকশনের মতো সত্য হতে পারে না।

এক ও অভিন্নর কারসাজি

করিমকে প্রথম দেখি সংসদ ভবনের সামনে বারোভাজা বেচতে। বিকালের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে ফেরার পথে সংসদ ভবনের ঢালাও ফুটপাতে তাকে প্রায়ই নজরে পড়ত। রঙচঙে বেশভূষা, মাথায় বারো রকমের কাপড়ের তাপ্পি জুড়ে চোঙের মতো টুপি, আর মুখে র্ছরা ছোটানো উদ্ভট বোলচালে হাসি পেলেও তাকে ঘিরে মানুষের ভিড়ের কারণ তার মজাদার মুচমুচে বারোভাজা। আলাপ হতে নাম বলেছিল করিম। সে অনেক দিন আগের কথা। নামটা মাথায় রয়ে গিয়েছিল। কিছুদিন পরে তাকে দেখলাম লালমাটিয়ায় আড়ংয়ের পাশের মাঠে কৈ মাছ বিক্রি করতে। চাঙারির ওপরে চওড়া ডালায় মাছগুলো নাচছে, চাষের অবশ্যই, বড় আর নাদুসনুদুস। কাছে গিয়ে ‘করিম না, মাছ-বেচা কবে শুরু করলা’ বলে কোনো সাড়া পেলাম না। সে ‘হাওরের কৈ হাওরের কৈ’ বলে বেদম হাঁকডাকে গ্রাহক জমাতে ব্যস্ত। ‘করিম না?’ আড়চোখে একনজর দেখে জবাব না দিয়ে বলল, ‘কিশোরগঞ্জের হাওরের মাছ, নিবেন?’ বলছে হাওরের, তবে সে যে নিজেই বিশ্বাস করছে না তার প্রমাণ মুখের ফিচেল হাসি।

এরপর তাকে নানা জায়গায় নানা বেশে দেখেছি। শহরে গিজগিজ মানুষ, এর মধ্যে করিম কেন আমার চোখ বারবার ধরা দিচ্ছে, এ এক রহস্য। একবার দেখলাম রমনা পর্কের সামনে বিশাল বেলুনের তোড়া  মাথার ওপর নাচিয়ে নিজেও হেলেদুলে নাচছে। শেষ দেখলাম এই সেদিন।

বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ট্রলিতে ডাই করা শীতের কাপড় দেখে আগ্রহ জাগল। ফ্যাক্টরি-রিজেক্ট জামাকাপড় সোয়েটার, জ্যাকেট, টুপি, মাফলার, স্কার্ফ। পুরনো নয়, কোনো কারণে বিদেশি ক্রেতা রিজেক্ট করেছে, খুঁত রয়েছে কোথাও, কিন্তু খোলা চোখে ধরার উপায় নেই। আসল কথা, একে নতুন, আর দাম যা, দোকানের তুলনায় মাগনা বলা চলে।

কাপড় ঘাঁটাঘাঁটির এক ফাঁকে বিক্রেতার দিকে চোখ পড়তে খুব যে অবাক হলাম তা না। তবে মুখ ফুটে না বলে পারলাম না, ‘করিম, কী খবর? নতুন ব্যবসা কেমন?’

করিম কান দিল না, এক ক্রেতাকে জিনিস বুঝিয়ে সে টাকা গোনায় মশগুল।

     ‘করিম?’

     ‘আমারে কন?’

     ‘আর কারে! পারও তুমি, এক কারবারে বেশিদিন মন টেকে না, না?’

     ‘কী কন? এই ব্যবসা করি আইজ কুড়ি বচ্ছর।’

     ‘ধুরো মিয়া, তুমি একসময় বারোভাজা বেচতা সংসদ ভবনের সামনে, আমি নিজে কত কিনছি তোমার বারোভাজা, তারপর কৈ মাছ, চাষের কৈ-রে হাওরের কৈ বইলা চিল্লাপাল্লা করতা, আর কী কী করছ কে জানে, এখন ধরছ কাপড়ের কারবার। ভালো তো।’

‘আমি জীবনে বারোভাজা না কী কইলেন বেচি নাই, আর কৈ মাছ? অমি বেচুম মাছ, কী কন এসব!’

     ‘তুমি করিম না?

     ‘হো, করিম।’

     ‘তাইলে?’

     ‘তাইলে কী! এক করিম তো ব্যাক-করিম না। এক নাম আর এক সুরতের মাইনষ্যে শওর ভরা। আপনের চেহারার কত মানুষ আছে বিছরাইয়া দেহেন। আর নাম, আপনের নামেরও কত মানুষ পাইবেন। একই চেহারা-সুরতের মানুষ ঘুইরা বেড়াতাছে, কিন্তুক ভিতরে একেকজন একেক চিজ। কইলেন না হাওরের আর চাষের কৈ, ওইরমই কেউ চাষের, কেউ হাওরের, আবার কেউ মেন্সিপাল্টির ডেরেইনের।’

ফ্যান্টাসি

নদী তীরে ডাঙ্গর কুমিরকে রোদ পোহাতে দেখেও একটা ছাগল খানিকটা দূরে সদ্য গজানো ঘাসে মুখ দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘোরাঘুরি করছিল। রোদ পোহানো অবস্থায় কুমিরকে সে হয়তো একটা শেকড় ওপড়ানো মরা গাছটাছ ভেবে থাকবে। তবে কুমিরটা একটু পরে চোখ খুলে অল্প দূরে লোভনীয় শিকার দেখে গা মুচড়ে মাথা তুলতেই ছাগলের হুঁশ হলো, পড়িমরি করে সে ছুটতে লাগল। কুমির মোটেও দমে না গিয়ে পিছু নিল। ছাগল ছুটছে, কুমির ছুটছে। উঁচু-নিচু জমি, খানাখন্দ, ঢাল, বাঁক পেরিয়ে ছোট ছোট পায়ে ছাগল যথেষ্ট দ্রুততায় ছুটলেও দেখা গেল পানি ছেড়ে ডাঙায় উঠেও শিকার তাড়া করতে কুমির কম যায় না। ধরে ফেলবে ফেলবে, বিকট হাঁ-মুখে এই বুঝি ছাগলকে তুলে নেবে, তখনই ছাগল আশ্চর্য কায়দায় ছিটকে সরে যাচ্ছে। একবার, দুইবার, কয়েকবার।

এভাবে চলতে থাকল ছাগল জান বাঁচাতে মরিয়া, এদিকে কুমিরও নাছোড়। মোবাইলে ভিডিও বন্ধ করে মাহবুবকে বললাম, তুই কার পক্ষে?

       শুরুতে ছিলাম ছাগলের পক্ষে, অবলা জীব। তবে কুমির ভারী শরীর নিয়ে যে পরিশ্রমটা করছে তাতে এখন মনে হচ্ছে ওকেই সাপোর্ট দেওয়া দরকার, উচিতও। হিরোইজমটা ওর, পানি ছেড়ে ডাঙা দাবড়ে বেড়াচ্ছে। আমি কুমির। তুই?

        আমিও। কিন্তু কুমির যদি ছাগলের সাথে পেরে না উঠে হাল ছেড়ে দেয়, তখন কি ছাগল হিরো?

       নাহ্। জান বাজি রেখে মুখে ফেনা তুলে ছুটেছে, হিরো হয় কী করে? 

ফের ভিডিও চালু করতে আশ্চর্য দৃশ্য, অকল্পনীয় বলা চলে। ছাগল ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এতক্ষণ বোঝা যায়নি, এবার দেখা গেল তার শিং দুটো অস্বাভাবিক বড়, আর শিং ঝাঁকিয়ে রুখে দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা বেপরোয়া। ভিডিও শেষ।

     মাহবুব বলল ফ্যান্টাসি দিয়ে কিছু হয় না।

      ফ্যান্টাসি আছে বলেই না ...

      কী?

      আমরা নিজেদের মাথায় চোখা শিং দেখতে পাই।

      কাজে তো লাগে না।

      তবু ...

কৃৎকৌশল

রোজ রাতে লোকটা চেয়ে চেয়ে দেখে ইঁদুরটা তার শোবারঘরে চক্কর কেটে ভাড়ারঘরে ঢুকছে। বিছানা ছেড়ে সে এঘর-ওঘর করে, ইঁদুরের দেখা মেলে না। রাগে-দুঃখে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে, কিন্তু কী লাভ, তারই চুল! সে ফন্দি আঁটল।

ইঁদুর যখন দেখল লোকটা সাবধান হয়ে গেছে, রাতে লাঠিসোটা নিয়ে শুতে যাচ্ছে, সেও সাবধান হলো। অনেক রাতে দরজার ছোট ফোকর দিয়ে চিড়াচ্যাপ্টা হয়ে ঘরে ঢোকে, তারপর ভেতরের অন্য দরজার চুল পরিমাণ ফাঁক দিয়ে নিঃশব্দে ভাড়ার ঘরে গিয়ে যা করার করে।

লোকটা টের পেয়ে হুলুস্থুল বাধাল। অবশ্য হুলুস্থুল করাই সার, ইঁদুরের খোঁজ পেল না। দুদিন যেতে সে অন্য পথ ধরল। চ্যাপা শুঁটকির টোপ গেঁথে লোহার জালি-জালি ফাঁদ পেতে রাখল দরজার কাছে। ইঁদুর সাবধান হলো। শুঁটকির মৌতাতে দিশেহারা হয়েও সে ফাঁদকে পাশ কাটিয়ে আগের মতো যেখানে খুশি ঘুরঘুর করে। রেগে গিয়ে লোকটা চারকোনা তক্তায় আঠা মাখিয়ে দরজার মুখে রাখল। ইঁদুর হাসল। শেষমেশ লোকটা কোথায় থেকে একটা লম্বা লেজওয়ালা বিড়াল নিয়ে আসতে ইঁদুর ভাবল, এবার?

বিড়াল রয়েছে, চিন্তা কী, লোকটা অনেক ক’টা রাতের বকেয়া ঘুম পুষিয়ে নিতে অনেক ক’টা ঘুমের বড়ি খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেল। ঘুমাল লোকটা, ঘুমিয়েই থাকল। শূন্য ঘরে ইঁদুর ও বিড়াল টিভি ছেড়ে টম অ্যান্ড জেরি দেখতে দেখতে হেসে কুটিকুটি হয়ে এ ওর গায়ে গড়ায়।

পরম্পরা

ইমারজেন্সির টানা বারান্দায় হুইল চেয়ারগুলো সিঙ্গেল ফাইলে। অনেকক্ষণ পরপর একটা-দুটো ঢুকছে, লাইনটাও ঢিমেতালে সামনে এগোচ্ছে। একটা হুইল চেয়ারকে ভেতরে ঢুকতে দিতে একটা সাদা টানটান কাপড়মোড়া স্ট্রেচার বেরিয়ে আসছে।

     এক সময় কয়েকটা হুইলচেয়ার ঝটপট ঢুকে পড়তে বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা পেয়ে লাইনটা খানিকটা এগোল। পাঁচটা হুইলচেয়ার ঢুকল, পাঁচটা স্ট্রেচার বেরোল। এটাই নিয়ম যতটা বেরোবে, ততটা  ভেতরে যাবে।

দরজার মুখে প্রথম হুইলচেয়ারে নাকে অক্সিজেনের নল নিয়ে কাত হয়ে বসা অধৈর্য তরুণী পেছনে দাঁড়ানো সঙ্গীকে বলল, আর কত? বেরোয় না কেন?

আর একটু। নেক্সট তোমার টার্ন।

তরুণী দেখে একটা স্ট্রেচার এগিয়ে আসছে। কাচের ভারী

দরজা খুলে যেতে যেটুকু সময়, তারপরই পিছলে বেরিয়ে

যাবে, সে তখন ঢুকবে। সে আন্দাজ করতে চেষ্টা করল

ভেতরে ঢুকে কতক্ষণে বেরোবে নিস্পন্দ, টানটান কাপড়মোড়া স্ট্রেচারে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত