সংকটেও ইতিবাচক পোশাক রপ্তানি

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৫, ০৬:৪৮ এএম

ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত অনেক কারখানার মালিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। দেশের বাইরে থেকেও অনেকে বিভিন্ন কারখানায় বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করে। এতে পোশাক শিল্পে নতুন সংকট তৈরি হয়, যা অন্তর্বর্তী সরকার সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। সরকারের এমন উদ্যোগের ফলে গত বছরের আগস্টের পর থেকেই এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত বছরের শেষ প্রান্তিক বা অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) থেকে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬ কোটি ৯১ লাখ ডলার, যা আগের প্রান্তিক বা জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আসা রপ্তানি আয়ের চেয়ে ৮৫ কোটি ডলার বেশি। এ ছাড়া গত বছরের তুলনায় যা ১৬২ কোটি ডলার বেশি রপ্তানি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক খাত এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ, এ জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারলে এই প্রবৃদ্ধি আরও এগিয়ে যাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশের আরএমজি রপ্তানির শীর্ষ গন্তব্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, কানাডা এবং বেলজিয়াম। এই ৯টি দেশ থেকে বাংলাদেশ (আরএমজি থেকে) ১ হাজার ৩৬ কোটি ৯১ লাখ ডলার আয় করেছে, যা মোট আরএমজি রপ্তানির ৮০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তার আগের বছরের একই সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এ আয়ের পরিমাণ ছিল ৮৭৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে আয়ের পরিমাণ বেড়েছে ১৬২ কোটি ডলার। এ ছাড়া জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ৯৫১ কোটি ২১ লাখ ডলার। সে হিসাবে বেড়েছে ৮৫ কোটি ডলার।

ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, তৈরি পোশাকের নেট রপ্তানি (আরএমজি রপ্তানিমূল্য থেকে কাঁচামাল আমদানিমূল্য বিয়োগ করে নির্ধারিত) ছিল ৬৩২ কোটি ৯৪ লাখ ডলার বা মোট আরএমজি রপ্তানির ৬১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে যে আয় দেশে এসেছে, এর মধ্যে নিটওয়্যার এগিয়ে আছে। আলোচ্য সময়ে নিটওয়্যার থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৫৪৮ কোটি ৭১ লাখ ডলার। অন্যদিকে ওভেন থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ৪৮৮ কোটি ২০ লাখ ডলার।

এ বিষয়ে তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, আমরা সংগ্রাম করতে জানি। আমাদের দেশের যারা শ্রমিক আছে তারা সংগ্রাম করতে জানে। আমাদের একটা করে সমস্যা হয় আমরা অন্যদিকে তা সমাধান করার চেষ্টা করি। আমরা যখন দায়িত্ব পালন করি তখন বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যার রেজাল্ট আমরা এখন পাচ্ছি। বর্তমানে আমাদের বিদ্যমান যে সমস্যাগুলো আছে, যেমন গ্যাস সংকট, ইলেকট্রিসিটি সমস্যা এগুলো যদি সমাধান হয় তাহলে এই খাতে আমাদের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তৈরি পোশাক খাতের জন্য কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে ৪০৩ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের। এ সময় রপ্তানি করা হয়েছে ১ হাজার ৩৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারের পোশাক। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি বাদ দিয়ে নিট রপ্তানি আয় হয়েছে ৬৩২ কোটি ডলার। আর জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে নিট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৫৬১ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ের ব্যবধানে নিট রপ্তানির পরিমাণও বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানির আয় বাড়াতে সরকার নানা সুবিধা দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা। করোনা-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি ঋণ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে। এ তহবিল থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য ঋণ সুবিধাসহ সুদহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা হয়েছে, যা ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানির ওপর ৪ শতাংশ হারে নগদ সহায়তার সুবিধা দেয় সরকার। একই সঙ্গে রয়েছে ২ শতাংশ হারে বিশেষ নগদ সহায়তা।

রপ্তানিকারকদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকার গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড রয়েছে, যা থেকে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির জন্য অর্থায়ন করে। এ ছাড়া আছে ১০ হাজার কোটি টাকার এক্সপোর্ট ফ্যাসিলিটেশন ফান্ড এবং এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড। এসব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত দিন দিন রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে শক্তিশালী খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর মধ্যেই চলতি অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের চেয়ে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় কমেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত