ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর মানিকগঞ্জের সিংগাইরে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা এলাকায় অবস্থান করায় অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। একাধিক মামলাকে পুঁজি করে পুলিশ তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সিংগাইর থানায় একটি হত্যাসহ ৪টি মামলা দায়ের হয়। এতে সাবেক দুই সংসদ সদস্য এবং ২২৫ জনের নাম উল্লেখসহ সহস্রাধিক লোককে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। গত ৫ আগস্ট বিকেলে ধল্লা পুলিশ ক্যাম্প ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়। এ ছাড়া বাকি মামলার ঘটনাগুলো আওয়ামী লীগ আমলের হলেও সেগুলো রেকর্ড হয় গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। এর মধ্যে রয়েছে ২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গোবিন্দলে সংঘটিত চার খুনের মামলা।
সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থক ৪৪ জন এবং ডেভিল হান্ট অভিযানে ১৪ জনসহ মোট ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের অধিকাংশই মামলার অজ্ঞাত আসামি হিসেবে আটক হন। এজাহারে তাদের নাম না থাকলেও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক হওয়ায় আটকের পর পুলিশ তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে এবং হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়। চাহিদামতো টাকা দিলে ফাঁড়ি ভাঙচুর কিংবা বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর না দিলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয় এবং আদালতে রিমান্ডের জোর আবেদন জানানো হয়।
ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার মাধবপুরের সানোয়ার হোসেনের কাছ থেকে ২ লাখ, চর লক্ষ্মীপুরের পোকা সাঈদের ১ লাখ দশ হাজার, আজিমপুরের শাহজাহান মীরের ১ লাখ, নয়াডাঙ্গীর আতাউল কন্ট্রাক্টরের ১ লাখ, পূর্ব বান্দাইলের ফরমান আলী খানের কাছ থেকে ১ লাখ, জামির্ত্তা রামকান্তপুরের আব্দুস ছামাদের ৭০ হাজার, কিটিংচরের জসিম উদ্দিন পাখির ৬০ হাজার, কাংশার ইসমাইলের কাছ থেকে ৫০ হাজার, আজিমপুর গোলাম রসুলের ৫০ হাজার, গোলাইডাঙ্গা-বাস্তার তারেকের ৫০ হাজার, জামশার সিদ্দিক মোল্লার ৫০ হাজার, তালেবপুর হুমায়ুন মেম্বারের কাছ থেকে ৫০ হাজার, চর লক্ষ্মীপুর জিন্নতের ২৫ হাজার, আজিমপুরের রশিদ মোল্লার ৩৪ হাজার ও আলমের কাছ থেকে ৩২ হাজার, চর আজিমপুর সামছুলের ৩০ হাজার টাকা ছাড়াও অপারেশন ডেভিল হান্টে গ্রেপ্তার সোহেল, নজরুল ভে-ার, আমজাদ হোসেন, রিয়াদ মেম্বারসহ প্রায় সবার কাছ থেকেই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার আসামিরা জেলহাজতে থাকাবস্থায় তাদের পরিবারের কাছ থেকে পুনরায় টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। আর দাবি করা টাকা না দেওয়ায় চর লক্ষ্মীপুরের সাঈদ, আজিমপুরের শাহজাহান মীর, নয়াডাঙ্গী আতাউলকে শ্যোন আরেস্ট দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও এদের কারও কারও বিরুদ্ধে একাধিক রাজনৈতিক মামলাও ছিল।
জামির্ত্তা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি খালিদ মাহমুদ খোকনের পরিবারের অভিযোগ, খোকনকে গ্রেপ্তারের পর ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই টাকা না দেওয়ায় তাকে গোবিন্দলের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়। বর্তমানে সে জামিনে এসে পুলিশের ভয়ে আত্মগোপনে রয়েছে।
অন্যদিকে, মামলার এজাহারভুক্ত আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী পুলিশকে হাত করে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে সিংগাইর থানা-পুলিশের এ গ্রেপ্তার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম। আর এ কাজে তার সহযোগী থানার দুই এসআই আবদুল মুত্তালিব ও মাসুদুর রহমান। ইতিমধ্যেই এদের থানা থেকে বদলির আদেশ হয়েছে। আবদুল মুত্তালিব ইতিমধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত এসআই মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ রকম কোনো তথ্যপ্রমাণ কেউ দিতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেবেন আমরা সেটাই মেনে নেব।’
সিংগাইর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ঘুষ নেওয়া ও হয়রানির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এ ধরনের কোনো বিষয় কাম্য না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে সহকারী পুলিশ সুপার (সিংগাইর সার্কেল) নাজমুল হাসান বলেন, ‘অভিযোগ গুরুতর, তবে কোনো লিখিত পাইনি। তার পরেও বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করে সত্যতা পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
