আর্থসামাজিক হাল বাস্তবতায় তারা গরম, চরম, নরম, পরম কোনোটাই নয়। শরম পাওয়ার অভ্যাসও নেই। পুরোটাই টিকে থাকার তাড়নার বিষয়। খেয়ে, না খেয়ে, মাঝেমধ্যে কারও পরমাদরে পড়ে যূথবদ্ধতায় তেজি হয়ে ওঠে। ঘটায় অঘটন। হয় শিরোনাম। নাম পড়ে গরমপন্থি, চরমপন্থি, উগ্রবাদী, সর্বহারা, লাল-নীল পতাকাসহ নানান কিছুর। আদতে তাদের বেশিরভাগই অভাবী। অভাব-অনটনসহ নানা কষ্টে দিগি¦দিক হারা। কোনো মতে, একটু স্বস্তিতে, নিরাপদে জীবন সাঙ্গ করতে পারলেই সন্তুষ্ট। কিন্তু, সেই সুযোগ মেলে না। ব্যক্তি বা মহল বিশেষের খপ্পর-টার্গেটেরই জয় হয়। হয়ে আসছে এভাবেই। সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, মেহেরপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার গভীর চিত্র এটিই। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক খুন-খারাবি, চাঁদাবাজিসহ নানান অপকর্মে জড়িতদের বেশিরভাগই এ সম্প্রদায়ের। রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতি, কোনো নীতিই তাদের নেই। বোঝে কামাই-রোজগারের নীতি। আড়ালে-আবডালে থেকে তাদের সেই বন্দোবস্তটা কে করে দিচ্ছে? কাদের বধ করার উদ্দেশ্যে সর্বহারা ‘চরমপন্থি’ নামে কিছু মানুষকে সংগঠিত করা হচ্ছে?
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই সম্প্রদায়টি তৎপর। কারামুক্ত হয়েছেন ওই এলাকার আলোচিত চরমপন্থি নেতা রিফুজি মঈন ও আসলাম ওরফে ট্যারা আসলাম। দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর এলাকায় ফিরেছেন শীর্ষ চরমপন্থি টাইগার খোকনের সহযোগী শাহীন ওরফে বড় শাহীন। তাদের সহযোগীরাও এলাকায় ফিরে রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করছে। এমপি আনার হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেভাজনরা মাঠে ঘুরছে। তারা হত্যাকা-ে ভাড়ায়ও খাটছে। পুরোটাই রিহার্সালের মতো। দীর্ঘ সময় তাদের কেউ কেউ ছিল আত্মগোপনে। কারাগারেও ছিল অনেকে। পরিচয় পাল্টে, এলাকা বদল করে শ্রমিক, ভ্যানচালক, দিনমজুরও সেজেছে অনেকে। এর মধ্যেই ঝিনাইদহের শৈলকুপায় ৩ জন হত্যা। তারা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে প্রচারিত। আর হত্যার দায় স্বীকারকারী জাসদ গণবাহিনী। তিনজন যে হত্যা হয়েছে তা সত্য। তাদের এবং হত্যাকারীদের সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে কথা আছে। কী কারণে এ হত্যা তাও প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপরই সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, মেহেরপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী এলাকায় ঘাঁটি তৈরি করেছিল বামপন্থি চরমপন্থিরা। মার্কস-লেনিন বা মাওবাদী আদর্শের নামে সেই সময় ওই এলাকায় ১৫টির বেশি সংগঠন ছিল। এক সময় তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ নামে। নিজেরা নিজেদের মেরেছে। সাধারণ অনেক মানুষ এসব বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন সরকার সময়ে সময়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। আত্মসমর্পণও করানো হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীদের আর্থিক সহযোগিতাসহ নানা সহায়তা করা হয়েছে। অস্ত্রসমর্পণের পর অনেককে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে চাকরি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। ফল ভালো হয়নি। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অন্তত দেড় হাজার চরমপন্থি আত্মসমর্পণ করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার। চরমপন্থিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। সরকারের ঘোষণায় সাড়া দিয়ে দুই হাজারের বেশি চরমপন্থি অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জেলায় আধিপত্য নিয়ে চরমপন্থিদের হাতে নিহত হন ৪শ’র বেশি মানুষ। পাবনা, সিরাজগঞ্জ এলাকায় সত্তরের দশকে কিছু বামপন্থি দল থাকলেও এখন আর তারা নেই। অনেকেই দলছুট হয়ে চুরি-ডাকাতির মতো কাজ করতে শুরু করে। তারা যত না চরমপন্থি, তার চেয়ে বেশি অপরাধী-সন্ত্রাসী। তা বললে আবার তারা চটে যায়। মাইন্ড করে। কিছুদিন ধরে তারা আবার পাবলিসিটি স্ট্যান্ডে ফিরেছে।
২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। সেই সময় দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোয় র্যাব ও পুলিশের হাতে বিভিন্ন চরমপন্থি দলের কয়েকশ সদস্য নিহত হয়। এসব বাহিনী দাবি করেছে, তারা ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০০৫ সালে ঢাকা থেকে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোফাখখার চৌধুরীর ‘ক্রসফায়ার’, ২০০৮ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল জনযুদ্ধ) নেতা আব্দুর রশীদ মালিথা বা দাদা তপন। একই বছরে আরও নিহত হয়েছিলেন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল লাল পতাকা) নেতা ডা. মিজানুর রহমান টুটুল। চরমপন্থি সংগঠনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন নেতা নিহত হওয়ার পর থেকে ওইসব সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা কমে আসে। আত্মসমর্পণের কিছুদিন পরে অনেকে পুনরায় চরমপন্থি দলে ফিরেছে। তাদের রাজনৈতিক কোনো নীতি নেই। আট দশ জন ডাকাতের মতোই তারা কাজ করে। অনেক ডাকাতও সর্বহারা সেøাগান দিয়ে ডাকাতি করে। সিরাজ শিকদার এবং মতিন-আলাউদ্দিন গ্রুপগুলোর নেতারা নিহত বা মারা যাওয়ার পরে তাদের দলগুলো একাধিক গ্রুপে ভাগ হয়ে যায়। এদের কোনো কোনো গ্রুপ পরবর্তী সময়ে ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আবারও চরমপন্থি নামে একটি গ্রুপের সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে কার বা কাদের হাত এ নিয়ে নানা কথা ঘুরছে। শৈলকুপায় পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি তিন জনকে একসঙ্গে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায় স্বীকার করে স্থানীয় গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছেন জাসদ গণবাহিনীর পক্ষে কালু পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি। তবে ওই ব্যক্তি আদৌ জাসদ গণবাহিনীর কেউ কি না অথবা আসলেই জাসদ গণবাহিনী ওই হত্যার সঙ্গে জড়িত কি না সে বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো নেই। টানা ১৬-১৭ বছর পরে আবার চরমপন্থি আতঙ্কের রহস্যভেদ করা জরুরি। গণবাহিনী গণমুক্তিফৌজ, জনযুদ্ধ, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিসহ অসংখ্য চরমপন্থির নাম মানুষ ভুলেই গিয়েছিল। ২০০৯ সালে তৎকালীন গণবাহিনী নেতা ওবায়দুল ওরফে লাল তিনজনকে জবাই করে তাদের মস্তক রেখে যায় গণপূর্ত বিভাগের গেটে। মস্তকের সঙ্গে রেখে যায় চিরকুট। কয়েকদিনের মধ্যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গেটে আরেকজন গণমুক্তি ফৌজ ক্যাডারের মস্তক রেখে যায় গণবাহিনী। নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও শত শত কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চরমপন্থিদের ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতারা। চরমপন্থিদের গুলিতে নিহত হয় কয়া ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা জামিল হোসেন বাচ্চু। ২০০৯ সালের ২২ জুন এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় কয়া হাতির সাঁকো নামক স্থানে। ১৫ আগস্ট ভেড়ামারায় একটি কাঙালি ভোজ অনুষ্ঠানে ব্রাশফায়ারে নিহত হন ভেড়ামারা আওয়ামী লীগের নেতা মেহেরুল ইসলাম ও তার বন্ধু বান্দা ফাতাহ মোহন। এ হত্যাকাণ্ডের পর চরমপন্থিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুবুল আলম হানিফের নির্দেশে পুলিশ চরমপন্থিদের গ্রেপ্তার করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জেরে বিরোধ আরও বাড়ে। প্রাণ যায় অনেকের। এখন হঠাৎ আবার বিরোধ, আবার লাশের হিসাব শুরু।
ঝিনাইদহের শৈলকুপার রমাচন্দ্রপুর গ্রামের শ্মশানঘাটে পড়ে থাকা হানিফ আলী (৫৬), তার শ্যালক লিটন (৩৫) ও রাইসুল ইসলাম রাজুর (২৫) মধ্যে হানেফ আলী নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক কমান্ডার। হানিফ আলীর বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার আহাদনগর গ্রামে, পিতার নাম রাহাজ উদ্দিন। হানিফ আলী পশ্চিমাঞ্চলের শীর্ষ চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধ (লাল পতাকার) আঞ্চলিক কমান্ডার। ৯০-এর দশকে হত্যা ও ডাকাতির মাধ্যমে এলাকায় অপরাধ জগতে একক আধিপত্য বিস্তার করে। হানিফের নামে হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ সদর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ১৪টি হত্যা, অপহরণ ও ডাকাতির মামলা আছে। গত সাত-আট বছর ধরে হরিণাকু-ু নারায়ণকান্দি কায়েতপাড়া বাঁওড় দখল করে মৎস্য চাষ করে আসছিল। ২০১৪ সালে জেল থেকে বের হয় হানিফ। পরে ২০১৮ সালে ঐ বাঁওড়ের মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়াকে জবাই করে হত্যা করে বাঁওড়ের দখল নেয় হানিফ। সম্প্রতি বাঁওড় দখলকে কেন্দ্র করে এলাকার কয়েকটি নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠনের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এর জেরে প্রতিপক্ষ জাসদ গণবাহিনী তাকে হত্যা করেছে বলে ধারণা এলাকাবাসীর। চরমপন্থি হানিফের এক ভাই হরিণাকুণ্ডু উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও আরেক ভাই উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের বর্তমান সহসভাপতি। হানিফ নিজে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। স্থানীয়দের বিবরণ মতে এগুলো টার্গেট কিলিং, গোলাগুলি নয়। ঘটনাস্থলের কাছে রাত ৯টার দিকে তারা তিন-চারটি গুলির শব্দই শুনেছেন। পরে গিয়ে দেখেন মাথায় গুলিবিদ্ধ লাশ তিনটি পড়ে আছে। জাসদ গণবাহিনীর কথিত নেতা কালু একটি চিরকুট লিখে এই তিন হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছেন। তার বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুর গ্রামে। ঘটনাটি চরমপন্থি স্বভাবের। কিন্তু, এর ভিত্তি চরম কি না ভাবনার বিষয়।
সেই বাহাত্তর-তিয়াত্তর বা আরও পরে সিরাজ শিকদারদের রাজনৈতিক দর্শন ও লক্ষ্য ছিল। পরে সেটি হয়ে যায় কেবলই সন্ত্রাস, ঠেকবাজি। যা কোনোক্রমেই রাজনীতির মানদ-ে পড়ে না। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদেরও তা শোভা পায় না। প্রতিবেশী ভারতে নকশালসহ চরমপন্থিদেরও নীতি, আদর্শ, দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু এ দেশে এখানে তা নিতান্তই ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ আদায়ের অপতৎপরতা। এরা বিচ্ছিন্নতাবাদী। না রাজনীতি, না সমাজ, না পরিবার কারও কাছেই এরা স্বীকৃত-সমাদৃত নয়। এরা সত্যিই চরমপন্থি বা নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের কি না, তা পরিষ্কার করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। এমনিতেই পুলিশসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো এখনো ট্রমায় পড়ে আছে। নিয়মিত কাজ করাই কঠিন তাদের জন্য। সেখানে প্রায় ডজনখানেক গজানো চরমপন্থি সংগঠনের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া তাদের জন্য বাড়তি কাজ। বাড়তি বলে ফেলে রাখার সুযোগ নেই। তা টপ প্রায়োরিটিতেই করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
