আবাসিক হোটেলে আগুন, প্রাণ গেল ৪ জনের

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৫, ০৬:৫৯ এএম

গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন বিদেশগামী ছেলেকে বিদায় জানাতে। বিশ্রামের জন্য উঠেছিলেন আবাসিক হোটেলে। আর সেখানেই অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু হলো মিরন জমাদ্দারের। ষাটোর্ধ্ব মিরনের বাড়ি পিরোজপুরের ভা-ারিয়া উপজেলার দারুলহুদা বটতলা গ্রামে। বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে ছেলে মুনিম জমাদ্দার বিদেশযাত্রা বাতিল করেছেন। বুক ভরা আক্ষেপ নিয়ে তিনি জানালেন, ‘দুই বছর আগে এমনই এক রোজার দিনে আমার মা (মুন্নি বেগম) মারা গিয়েছেন। আজ আমার বাবা মারা গেলেন। আমার আর কেউ রইল না। কার জন্য আর বিদেশ যাব। আমার আট বছরের বোনটাও আমার মতো এতিম হয়ে গেল। বাড়িতে গিয়ে ওকে কী বলব!’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাবার মরদেহ নিতে এসে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে হতবিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন মুনিম। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, ‘দুদিন আগে আমি গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম। রামপুরা বউবাজার এলাকায় চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠেছিলাম। কাল মঙ্গলবার (আজ) আমার ফ্লাইট। আমাকে বিদায় জানাতে আমার বাবা আর মামা আজ সোমবার সকালে এসেছিলেন। সকালে শাহজাদপুর ওই হোটেলে ওঠার পর আমাকে ফোনে জানান। আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। হোটেলটিতে ঢোকার সময় আগুন দেখতে পাই। তখন আর ঢুকতে পারিনি। ফোন দিই বাবাকে, রিসিভ করে বলেন আগুনের প্রচন্ড ধোঁয়ায় আটকে পড়েছেন। তিনি মুনিমই বাবাকে চারতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে যেতে বলেন। মিরন জমাদ্দারও সৌদিপ্রবাসী ছিলেন। ৮-৯ বছর আগে তিনি দেশে আসেন।’

গতকাল রাজধানীর শাহজাদপুরের বীর-উত্তম রফিকুল ইসলাম অ্যাভিনিউর মজুমদার ভিলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভবনটিতে আগুন লাগার পর সেখানকার আবাসিক হোটেলে থাকা চারজন ভয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করেন। তবে এমন সময় ছাদে থাকা চিলেকোঠার দরজাটি ছিল বন্ধ। অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে ঘটনাস্থলেই চারজনের মৃত্যু হয় বলে দাবি করেছে ফায়ার সার্ভিস। আগুন নির্বাপণের পর ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিস ঢাকা জোনের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার ১০ মিনিটের মধ্যে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। ছয়তলা ভবনটির নিচতলা হার্ডওয়্যারের দোকান, দোতলায় বিউটি পার্লারের দোকান, তৃতীয়তলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত আবাসিক হোটেল। দোতলায় প্রচণ্ড আগুন এবং ধোঁয়া ছিল। ঘটনাস্থলে পৌঁছে চারটি ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট কাজ করে। প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনি। আগুনের ধোঁয়ায় চারজন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ভবনের ছয়তলার ছাদের দরজার সামনে থেকে। একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে হোটেলের বাথরুম থেকে। এ ছাড়া দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।’

পার্লার থেকে আগুনের সূত্রপাত ও নিয়ম মেনে তৈরি হয়নি ভবন : ভবনটি নির্মাণের সময় মানা হয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়মনীতি। এ ছাড়া আগুনের সূত্রপাত হয়েছে দোতলার গোল্ডেন টিউলিপ নামে একটি বিউটি পার্লার থেকে। এমনটি জানা গেছে ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের সঙ্গে কথা বলে। তবে আগুন লাগার বিষয়ে এখনো কোনো পক্ষই নিশ্চিত হতে পারেনি।

এসব বিষয়ে কাজী নজমুজ্জামান বলেন, ‘রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী বিল্ডিংটি তৈরি করা হয়নি। ভবনটিতে কোনো ফায়ার সেফটি প্ল্যান ছিল না এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। সিঁড়িগুলো ছিল সরু। সিঁড়ির পাশে যে জানালা ছিল, সেগুলো কাচ দিয়ে বন্ধ করা ছিল। কাচ দিয়ে বন্ধ না থাকলে ধোঁয়া বের হয়ে আসতে পারত। আমরা মালিক কর্তৃপক্ষের কাউকে পাইনি। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এরপর আগুন লাগার কারণ ও সূত্রপাত কোথা থেকে হয়েছে সেটি বলা যাবে।’

আগুন লাগা ভবনটি ছিল মৃত্যুফাঁদ : সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ‘রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকায় মূল সড়কের পাশেই ছয়তলা একটি বহুতল ভবন। সেই ভবনটির নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত সরু একটিমাত্র সিঁড়ি। সিঁড়িটি এতটাই সরু, পাশাপাশি দুজন মানুষের হাঁটা দায়। শুধু তা-ই নয়, ভবনটির কোনো তলায় নেই জরুরি নির্গমন ব্যবস্থা, নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ছিটেফোঁটাও। এতসব অনিয়ম নিয়েও সেই ভবনটিতে তৈরি করা হয়েছে আবাসিক হোটেল। ভবনের চারতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত অবস্থিত সেই হোটেলটির নাম দেওয়া হয়েছে হোটেল সৌদিয়া আবাসিক। মূলত হোটেলের নামে সেটি ছিল এক মৃত্যুফাঁদ। এ ছাড়া ভবনটির নিচতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত রয়েছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আগুন লাগা ছয়তলা ভবনটির নিচতলায় রুমা ডিজিটাল নামে একটি স্টুডিও এবং মা ডোর সেন্টার অ্যান্ড ফার্নিচার ও মুন্নি এন্টারপ্রাইজ নামে দুটি দোকান রয়েছে। এগুলো সবগুলোই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোতলার বিউটি পার্লারটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ভবনের ভেতরে বিভিন্ন ফ্লোরে কাচের ভাঙা টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তবে তৃতীয়তলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত অবস্থিত আবাসিক হোটেল খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়েছিল। ভবনের ছয়তলার অর্ধেক হোটেলরুম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল আর বাকি অর্ধেক ছাদ। ছাদের দরজাটি ছিল তালাবদ্ধ। উপস্থিত লোকজনের ভাষ্য, যদি ছাদের দরজাটি তালাবদ্ধ না থাকত, তাহলে এই মানুষগুলো বেঁচে যেতে পারতেন।’

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাথরুমে যে মরদেহটি পাওয়া গেছে, সেটি ছিল ভবনের চারতলায়। এর আগে এই ভবনে কাচ্চি খাদক নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। সাত মাস আগে ওই রেস্টুরেন্টে আগুন লেগে এই ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু তখন কেউ মারা যাননি। এ কারণে হয়তো এই ভবনের মালিকরা কোনো শিক্ষা নেননি। বিল্ডিংটাকে মৃত্যুকূপ বানিয়ে রেখেছিল।

এ বিষয়ে ডিএমপির গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘ভবনটির চারতলা থেকে একজনের ও ছয়তলার ছাদের গেট থেকে তিনজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। মরদেহগুলো আগুনের তাপে কিছুটা পুড়ে গেছে, তবে বাকি শরীর ঠিকঠাক রয়েছে। আমাদের প্রাথমিক ধারণা, এই চারজন আগুনের সৃষ্ট ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে। আমরা এখন পর্যন্ত একজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছি। বাকি তিনজনের নাম-ঠিকানা জানা যায়নি। আমাদের ধারণা, এই চারজন হোটেলের গেস্ট ছিলেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে এসে বিউটি পার্লারের এবং হোটেলের কাউকে পাইনি। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও এই দুই প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্তৃপক্ষকে বা কর্মচারীকে পাইনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত