ঘন ঘন লোডশেডিং ও গ্রিড রক্ষণাবেক্ষণের নামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে পল্লী বিদ্যুতের পাঁচজন কর্মকর্তা দেশের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সিস্টেমলসের নামে গ্রাহকদের মিটার রিডিং বাড়িয়ে মানুষের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করেন পল্লী বিদ্যুতের ওই কর্মকর্তারা।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন একটি টিম অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। সংস্থাটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযুক্ত পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করবে অনুসন্ধান টিম।
দুদক জানায়, ওই পাঁচজন কর্মকর্তা মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম রাজন কুমার দাসের নেতৃত্বে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ২২৫ কোটি টাকা চাঁদা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এর তিন দিন পর গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে আন্দোলন পরিচালনার জন্য ২২৫ কোটি কোটি টাকা চাঁদা সংগ্রহ করেন মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম রাজন কুমার দাস ও বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী হুমায়ুন কবিরসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিকানা অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। কমিশন গত ১৪ অক্টোবর এ অভিযোগটি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. সহিদুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি টিম অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা ও উপসহকারী পরিচালক মো. শাহজালাল।
দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত অনুসন্ধান টিম গঠনসংক্রান্ত নোটিসে বলা হয়, বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর, বি-বাড়িয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম আসাদুজ্জামান, মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম সামিউল কবীর ও বিপাশা ইসলাম এবং মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম রাজন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে নির্ধারণ সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হলো।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে পল্লী বিদ্যুতের সমন্বয়কারীরা দেশের ৮০ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে ২২৫ কোটি টাকা চাঁদা সংগ্রহ করেন। আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন মুন্সীগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম রাজন কুমার দাসের নেতৃত্বে পল্লী বিদ্যুতের সদর দপ্তরের এজিএম (এইচআর প্রশাসন) রাজিবুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম বিপাশা ইসলাম ও এজিএম মাহবুব আলম, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমান, লাইনম্যান এনামুল কবিরসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অর্থ সংগ্রহ করেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য এতদিন সময় বেঁধে দিয়ে স্টেশন ত্যাগ করতে বলা হলেও পরবর্তী কর্মসূচিতে সরকারকে না জানিয়ে গণছুটিতে যাওয়া ও সারা দেশে একযোগে বিদ্যুৎসেবা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো পরিকল্পনা নেন পল্লী বিদ্যুতের সমন্বয়কারীরা। তারা হোয়াটসঅ্যাপে পাঁচ-ছয়টি গ্রুপ খুলে সারা দেশে তাদের সমর্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, জুম মিটিং ও দিকনির্দেশনামূলক মতামত দিয়ে যান। পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যানদের চাকরি স্থায়ীকরণের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। টাকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তারা আন্দোলনের নামে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ষড়যন্ত্র করেন।
অভিযোগে বলা হয়, পল্লী বিদ্যুতের কয়েকজন কর্মকর্তা ঘন ঘন লোডশেডিং গ্রিড রক্ষণাবেক্ষণের নামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে দেশের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে ফেলে সরকারবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা করতে কাজ করেন। একই সঙ্গে তারা সিস্টেমলস দেখিয়ে গ্রাহকদের মিটার রিডিং কয়েকগুণ বাড়িয়ে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়া এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত আন্দোলনকারীদের মাঠে নামাতে আর্থিক সহায়তা করার চেষ্টা করেন।
