রমজানে ধর্মীয় আবহে সজ্জিত হয় লন্ডন

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৫, ০৬:৪২ এএম

লন্ডনে এক ভিন্ন আমেজ নিয়ে রমজানের আগমন ঘটে। রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লন্ডনের মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে একত্র হয়, মসজিদে নামাজ আদায় করে এবং ঘরবাড়ি সাজিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে। এভাবে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিম পরিবারগুলোতে রমজানের উৎসবমুখর আবহ ফুটে ওঠে এবং স্থানীয় বাজারগুলোতে সাহরি ও ইফতারসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ের ধুম লাগে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আত্মশুদ্ধি ও পরোপকারে এগিয়ে আসে। তাই এখানে রমজান শুধু রোজা ও নামাজের মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, দানশীলতা, সংহতি ও একতারও মাস।

লন্ডনের বাসিন্দা ও প্রকৌশলী নাওয়াল আদম জানান, কীভাবে তার পরিবার রোজা, নামাজ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনকে মানিয়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রমজানের আগে থেকেই আমাদের ঘর সাজাই এবং খাবারের পরিকল্পনা করি। আমার পরিবার বড়, তাই সবাইকে একসঙ্গে মসজিদে তারাবির জন্য নিয়ে যেতে আমরা গাড়ির ব্যবস্থা করি। এ ছাড়াও ইফতার প্রস্তুতি সহজ করতে আমরা আগেই পরিকল্পনা করে রাখি।’

তার মতে, রমজানে পরিবারের একত্র হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে রোজা রাখা চ্যালেঞ্জের হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, পরকালের পুরস্কার সব কষ্টের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেন, ‘এটা সত্যিই অনেক কঠিন। তবে আলহামদুলিল্লাহ, আমরা ধন্য। মহান আল্লাহ আমাদের পরিশ্রমের জন্য পুরস্কৃত করবেন।’

অনেকেই রমজানে নিজের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনের বিষয়ে ভাবেন এবং আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ হওয়ার পরিকল্পনা করেন। ৩৩ বছর বয়সী লন্ডনের আরেক বাসিন্দা রাক বলেন, ‘আপনি নিজেকে এক নতুন মানসিক অবস্থায় নিয়ে আসেন, নিশ্চিত করেন যে আপনি অন্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করছেন। আর এখন খুব শোচনীয় সময়, বাইরের দুনিয়ায় যারা কষ্ট পাচ্ছে আপনি তাদের কথা ভাবেন। আপনি সম্ভব হলে আরও দানশীল হওয়ার চেষ্টা করেন। রমজান মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সংহতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে। রমজান আমাদের সব ভাই-বোনকে একত্র করে, যেখানে আমাদের একটি অভিন্ন লক্ষ্য থাকে।’

অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়িতে রমজানের আবহ ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৫ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্রিটিশ-মিসরীয় জালাল ইউসুফ জানান, তার স্ত্রী তাদের ঘরকে রমজানের উৎসব ও আধ্যাত্মিক ভাবধারার সঙ্গে মানানসই করে সাজান। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী রমজান উপলক্ষে সবকিছু সজ্জিত করেন। আর সাজসজ্জায় আমরা কিছু মিসরীয় উপকরণ যোগ করি, যেন ঘরটা আরও আপন মনে হয়। এসব কিছুর উদ্দেশ্য হলো, এক মাস রোজা রাখার জন্য আমাদের পরিবারের সবাই যেন শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে।’ ইউসুফ আরও জানান, মসজিদগুলো রমজানে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একতা গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, ‘মসজিদে সম্প্রদায়গত যে বন্ধন তৈরি হয়, তা অসাধারণ। আমরা এখানে একত্র হই, কোরআন তেলাওয়াত করি ও শুনি এবং একে অপরের সম্পর্কে জানি। যদি আপনি মসজিদে না যান, তবে ইংল্যান্ডে রমজানের অনুভূতি পাবেন না।

লন্ডনের বিভিন্ন মসজিদ রমজানের গুরুত্ব বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। উত্তর ফিনচলি মসজিদের ইমাম হামিদ কুরেশি জানান, কীভাবে তারা রমজানের পুরো মাসে কোরআন খতম করার পরিকল্পনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি রাতে তারাবির নামাজের আয়োজন করি, যেখানে ৩০ দিনে কোরআন সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করি। ইবাদতের পাশাপাশি মসজিদে সাহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা হয় এবং দক্ষ কারিদের সঙ্গে মুসল্লিদের সংযুক্ত করা হয়, যাতে তারা কোরআন শেখার সুযোগ পায়।’

লন্ডনের মুসলিম সম্প্রদায় রমজানে বিশ্ব জুড়ে মুসলমানদের দুর্ভোগ গভীরভাবে অনুভব করে। ইমাম হামিদ কুরেশি বলেন, ‘যেকোনো স্থানে মুসলিম উম্মাহর ওপর যা ঘটে, তার প্রভাব আমাদের সবার ওপর পড়ে। মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের মতো। দেহের একটি অংশ কষ্ট পেলে পুরো দেহই তা অনুভব করে। আমরা আমাদের ভাই-বোনদের দুঃখ অনুভব করি, বিশেষ করে গাজা, সুদান, লেবানন, সিরিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের দুঃখে আমরা গভীরভাবে পীড়িত হই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের জন্য দোয়া করি।’

আনাদুলু এজেন্সি থেকে ভাষান্তর আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত