জনপরিসরে সভা-সমাবেশের নিষেধাজ্ঞা মানা হচ্ছে না

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৫, ০৫:৩২ এএম

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। যে জায়গাগুলোর একটি শাহবাগ মোড়। গত ১৩ মার্চ ডিএমপি অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে এ-সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শাহবাগে মিছিল-সমাবেশসহ প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছে বেশ কয়েকটি দল ও সংগঠন। আর এসব কর্মসূচির কারণে যানজটের পাশাপাশি ফুটপাতে চলাচলে বিঘ্নের মাধ্যমে জনভোগান্তি সৃষ্টি হয়।

যদিও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এ ধরনের মিছিল-সমাবেশ আইনের দৃষ্টিতে বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর এ রকম বেআইনি সমাবেশে অংশগ্রহণের শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা। তবে এখন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পালন করা এ ধরনের কোনো কর্মসূচিতে বাধা দিতে দেখা যায়নি পুলিশকে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখতে তারা সহনশীল অবস্থানে রয়েছেন।

ডিএমপির জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ‘সর্বসাধারণের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপি অধ্যাদেশের ২৯ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে আজ (১৩ মার্চ) থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ সচিবালয়, প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা ও পাশের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, শাহবাগ মোড়, কাকরাইল মোড় ও মিন্টো রোডে যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ, গণজমায়েত, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করা হলো।’

যদিও এই গণবিজ্ঞপ্তি জারির ৯ দিনের মাথায় গত শনিবার শাহবাগ এলাকায় একাধিক সংগঠনকে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সমাবেশ করতে দেখা যায়। ওই কর্মসূচিগুলোর কারণে শাহবাগসহ এর আশপাশের সড়কগুলোয় যান চলাচলে বিঘœ ঘটে। ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ইফতারের আগে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে। ওইদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিচার ও রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাবেশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে ‘জুলাই মঞ্চ’-এর ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে শাহবাগ মোড়ে বিক্ষোভ করেন। এ ছাড়াও ‘ছাত্র-জনতার সমাবেশ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভকারীদের আরেকটি দল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার বিচার এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার অপসারণ দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ করে। এ সংগঠনটি সারা দেশে ধর্ষণের শিকার নারীদের জন্য ন্যায়বিচারেরও দাবি জানায়।

সেদিন শাহবাগে কর্মসূচি পালন করা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের মন্তব্য চাওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা অমান্যের বিষয়ে। তাদের একজন দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে জায়গায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল করেছি আমরা, আমি মনে করি সেটি ডিএমপির নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ, আমরা সমাবেশ করেছি শাহবাগ জাদুঘরের সামনে। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনার গিয়েছি। এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ডিএমপির নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন এলাকা না।’

এ ছাড়া ওইদিন শাহবাগে সমাবেশ করেছে ‘জুলাই মঞ্চ’ এবং ‘ছাত্র-জনতার সমাবেশ’-এর ব্যানারে একদল লোক। জুলাই মঞ্চের জমায়েত শাহবাগ চার রাস্তার মোড় বেশ কিছুক্ষণ অবরোধ করে রাখে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জুলাই মঞ্চের দুই সংগঠক অর্ণব হুসাইন ও শাকিব হোসেনের মোবাইল ফোনে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় কল করা হলে তারা রিসিভ করেননি। অন্যদিকে ‘ছাত্র-জনতার সমাবেশ’ নামে যারা সেদিন ছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে যেদিন ডিএমপি শাহবাগসহ অন্যান্য এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা দেয়, সেদিন থেকে পরের দুদিন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ শাহবাগে অবস্থান নিয়েছিল ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদী কর্মসূচিতে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদির মোবাইল ফোনে গতকাল সন্ধ্যায় কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।

নিষেধাজ্ঞা ভেঙে সভা-সমাবেশের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হলে ডিএমপির মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সভা-সমাবেশ তো আসলে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। আমরা এই অধিকারকে সমুন্নত রাখতে চাই। আর গণবিজ্ঞপ্তিতে আমরা বিশেষ করে যমুনা, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় ও সচিবালয় এলাকাকে প্রাধান্য দিয়েছি। শাহবাগ মোড় বা তার ওই পাশটায় হলে গণতান্ত্রিক অধিকার বিবেচনায় সেটা “ওভারলুক” করার চেষ্টা করি। তবে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনভোগান্তির বিষয়টি মাথায় রাখবে এমনটা প্রত্যাশা করি।’

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে কী ধরনের শাস্তি : নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমায়েত, সভা, সমাবেশ ও মিছিলকে বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যারা এ ধরনের বেআইনি সমাবেশে সম্পৃক্ত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, ‘নির্দেশ অমান্য করলে সেগুলো বেআইনি সমাবেশ বলে গণ্য হয়। পেনালকোড (দণ্ডবিধি) অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

দণ্ডবিধি অনুযায়ী, পুলিশ শক্তি প্রয়োগে এ ধরনের সমাবেশ ভেঙে দিতে পারে এবং এ কাজ করার সময় যেকোনো ব্যক্তির সাহায্য চাইতে পারে। এ ধরনের সমাবেশে অংশগ্রহণকারী নেতাদের এবং অন্যদের গ্রেপ্তার ও আটক করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেআইনি সমাবেশে অংশগ্রহণের শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত