বাংলাদেশি পোশাকে মার্কিন উচ্চশুল্ক উচিত হয়নি

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:০৪ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে বর্তমানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাজার অর্থনীতির মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বিকল্প বাজার অনুসন্ধানেরও পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান জানিয়েছেন বাংলাদেশের পোশাকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্ক আরোপ করা উচিত হয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্তে মার্কিন ক্রেতাদের জীবন বিঘ্নিত হবে। এতে মার্কিন নাগরিকদের জীবন আরও নিরাপদ হবে- সেই সম্ভাবনা নেই, বরং মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন পল ক্রুগম্যান।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (পিআরআই) আয়োজিত ‘শুল্ক কারসাজির যুগে বাণিজ্যনীতি, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘ট্রাম্প বাজার অর্থনীতি ছুড়ে ফেলেছেন। তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যে ধরনের একতরফা শুল্ক আরোপ করছেন, তা ইতিহাসে বিরল। এমনকি বিশ্বায়ন ব্যবস্থাকে যারা তৈরি করেছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই এখন সেটি ভেঙে দিচ্ছে।’

রেহমান সোবহান আরও বলেন, বর্তমানে আর ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’-এর যুগ নেই। এখন টিকে থাকবে তারা, যারা ভালো চুক্তি ও দর-কষাকষি করতে পারবে। অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে এখন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি অর্থনৈতিক নিয়মে নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিবেচনায় পরিচালিত হচ্ছে।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, গত ২ এপ্রিল ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়, যা দেশের তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলোকে চাপে ফেলেছে।

রেহমান সোবহান তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কমান্ড ইকোনমির’ দিকে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেভাবে সুতা আমদানি করা হয় বিনা শুল্কে, তেমনি আমরাও যদি মার্কিন চাপে সব পোশাক ওই সুতা দিয়ে তৈরি করতে বাধ্য হই, তাহলে বাজার নয়, তা হবে কমান্ড অর্থনীতি। বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যবস্থা এত সরল নয় যে হুকুমে চলবে।’

ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের কারণে রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের সমালোচনা করে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাণিজ্যের বিষয়টিকে এখন অস্ত্রে রূপান্তরিত করেছেন। এ ধরনের শুল্কারোপ অন্যায্য এবং বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিওর নীতির প্রতি অবহেলা। তবে শেষ পর্যন্ত এ শুল্ককাঠামো টেকসই হবে না। খোদ যুক্তরাষ্ট্রই এ পদক্ষেপ থেকে কোনো সুফল পাবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বাণিজ্যঘাটতি মোকাবিলার চেষ্টা করছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল ঘটনা। এমন ঘটনা আগে কখনো দেখা যায়নি। এর মধ্য দিয়ে বাজার অর্থনীতি ছুড়ে ফেলে দিলেন ট্রাম্প।

সেমিনার সঞ্চালনা করেন পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার। এ সময় তিনি বলেন, নতুন করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ইতিহাসে এটা খারাপ অধ্যায় হয়ে থাকবে। এটা শেষ ধাক্কা। আমরা কীভাবে সেখান থেকে বের হব, সেটা কেউ জানে না। যুক্তরাষ্ট্রও বাণিজ্যঘাটতিতে আছে, তারা যা উৎপাদন করে, তার চেয়ে বেশি খরচ করে। বাংলাদেশ চলতি হিসাবের ঘাটতিতে আছে, অর্থাৎ আমরা সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছি। এটা খারাপ কিছু নয়।

জাইদী সাত্তার আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বাংলাদেশের করভার অনেক; নিয়মনীতিতে স্বচ্ছতা নেই। দুর্নীতি আছে, মেধাস্বত্ব অধিকার নেই। সরকার কর কমিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু এর বাইরে যে সমস্যাগুলো আছে, তার সমাধান হবে কীভাবে।

সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য রাখেন গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান,  গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশনের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) প্রমুখ ।

এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান জানিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বন্ধুস্থানীয় ও প্রতিবেশী দেশেও উৎপাদন করা প্রয়োজন, এতে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ভরসা করা যায়। এই উভয় বিবেচনায় বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কানাডা ও মেক্সিকোর মতো দেশের পণ্যে উচ্চশুল্ক আরোপ করা ঠিক হয়নি বলে মনে করেন পল ক্রুগম্যান।

আলোচনায় মার্কিন বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ রবার্ট লাইথিজারের কথা বলেন পল ক্রুগম্যান। বলেন, তার এই বন্ধু ওয়াশিংটনে বাণিজ্য সংরক্ষণবাদী হিসেবেই পরিচিত। বাণিজ্যের জগতে তিনি এক রকম শয়তান হিসেবে পরিচিত, যদিও নিজের কাজটা তিনি খুব ভালো বোঝেন, সে কারণে সব মহলেই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি স্বাধীনচেতা মানুষ; সে কারণে ট্রাম্প প্রশাসনে তার ঠাঁই হয়নি। হলে তিনি হয়তো বলতেন, বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে বলে যে সাজ সাজ রব তোলা হয়েছে, এই পাল্টা শুল্ক আরোপের পক্ষে সেটাই সবচেয়ে জোরালো যুক্তি। কিন্তু তাতে কি আদৌ যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এই প্রশ্নের জবাবে পল ক্রুগম্যান বলেন, উচ্চশুল্ক আরোপ করে বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনা প্রকৃতই কঠিন। এর মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে যার কারণে শুল্কের প্রভাব কমে যায়এই বাস্তবতায় উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করেও বাণিজ্যঘাটতি তেমন একটা কমানো সম্ভব নয়। একটা সম্ভাবনা আছে, এ রকম কোনো দেশ অতি উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করে দিলে তা সম্ভব হতে পারে অর্থাৎ আপনার বাণিজ্য না থাকলে তো আর বাণিজ্যঘাটতি থাকবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত