৪৩ বছরের ঐতিহ্য বন্ধে মরিয়া প্রশাসন, অবিচল উদীচী 

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২৭ পিএম

৪৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী পহেলা বৈশাখী মেলা এবার তিন দিনব্যাপী না হয়ে একদিনের জন্য আয়োজিত হবে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ মেলার অনুমতি না দেওয়ার পর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং বরিশাল নাটক সীমিত আকারে হলেও এই আয়োজনটি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুলিশ প্রশাসন তাদের সিদ্ধান্তে একেবারে অনড়, তবে উদীচী তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক। এমন ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে বৈশাখী মেলার মতো বড় আয়োজনে যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষ করে আমাদের কাছে গোপন তথ্য ছিল, এই মেলাকে কেন্দ্র করে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’  

‘এছাড়া, সরকারিভাবে বেলস পার্কে একটি বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। তাই একই সময়ে অন্যত্র আরেকটি মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কাছে যতটুকু ফোর্স রয়েছে, তা দিয়ে একাধিক স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।  আমরা যদি এখন অনুমতি দিই এবং পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হয়, তাহলে এর দায়ভার কে নেবে? সব দিক বিবেচনা করে আমি আয়োজকদের অনুরোধ করেছি, তারা যেন এবারের মেলাটি না করেন। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় এটাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত বলে আমি মনে করি,’ বলেন পুলিশ কমিশনার।

কিন্তু সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রশ্ন—বেলস পার্কে সরকারি মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে, চার দশকের ঐতিহ্যবাহী এই মেলা নিয়ে এমন আপত্তি কেন? কেউ কেউ বলছেন, এটি কেবল নিরাপত্তার অজুহাত নয়—সংস্কৃতি নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রকাশ।

তবে উদীচী কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এই ঐতিহ্য বন্ধ করতে রাজি নয়। কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও বরিশাল উদীচীর সভাপতি অ্যাডভোকেট বিশ্বনাথ দাশ মুন্সি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবছর তিন দিনব্যাপী যে বৈশাখী মেলা আমরা আয়োজন করে আসছি, এবার সেটি সীমিত আকারে একদিনের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের দিন ভোর সাড়ে ৬টায় প্রভাতী অনুষ্ঠান, এরপর দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং মেলা অনুষ্ঠিত হবে।’ তবে যদি নিরাপত্তার কোনো শঙ্কা থাকে, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করে আমরা চেষ্টা করেছি মেলার অনুমতি পাওয়ার জন্য। আয়োজনের সমস্ত প্রস্তুতিও আমরা সম্পন্ন করেছি। কিন্তু তবুও অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাদের প্রশ্ন—কেন দেওয়া হয়নি সেই ব্যাখ্যাও তো আমরা পাইনি।’

উদীচীর এই প্রবীণ সংগঠক আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ‘এই মেলাটি শুরু হয়েছিল ১৩৮৯ বঙ্গাব্দে। তারপর থেকে একবারের জন্যও থামেনি। বোমা হামলার হুমকি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ—কোনো কিছুই আমাদের দমাতে পারেনি।’

শেষে তিনি অনুরোধ জানান, ‘উদীচীর পক্ষ থেকে আমরা বৈশাখী মেলার অন্তত একদিনের আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রেখেছি। এজন্য আমরা বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছি—অবশ্যই যদি অস্থিরতার কোনো শঙ্কা থাকে, তবে তা সামাল দিতে যৎসামান্য ফোর্স দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করা হোক।’
 
উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক অধ্যাপক বদিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সারা বাংলাদেশে খোঁজ নিয়েছি—সর্বত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ ও নীতি তো এক হওয়া উচিত। সব জেলায় মেলা হচ্ছে, আনন্দ-উৎসব হচ্ছে। তাহলে বরিশালেই বা বন্ধ থাকবে কেন? বর্তমানে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মেলা বন্ধের কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। যখন সারা দেশে হচ্ছে, তখন বরিশালেই শুধু থেমে থাকবে—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

তিনি বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আনন্দ শোভাযাত্রায় রূপান্তর করা হয়েছে—সেই জায়গায় আমরা কোনো সংঘাতে যাব না। কারণ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী মেলা কখনোই রাজনীতির বিষয় ছিল না, নয়ও। এই আয়োজন সংস্কৃতির, মানবিক মিলনের, আনন্দের—একে রাজনীতির ময়দানে ঠেলে দেওয়া আমরা সমর্থন করি না।’

স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক বদিউর রহমান বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে তো রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে স্থানীয়ভাবে পুলিশ কমিশনার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলেন—তা আমাদের বোধগম্য নয়। পুরো বাংলাদেশ এক নিয়মে চলে—বরিশাল কেন ব্যতিক্রম হবে?’

তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, ‘আমার ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক অবস্থান পরিষ্কার—আমরা মেলা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই রয়েছি। যদি কেউ এসে জোর করে বন্ধ করতে চায়, তারা করবে। কিন্তু উদীচী নিজে থেকে কখনোই এই ঐতিহ্যবাহী মেলা বন্ধ করবে না। কারণ, এ মেলা কেবল আয়োজন নয়—এ আমাদের চেতনার উৎসব।’

প্রসঙ্গত, বরিশাল উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গত ৪২ বছর ধরে বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ মাঠে ‘উদীচী বৈশাখী মেলা’ আয়োজন করে আসছে। এই মেলায় সহযোগিতা করেন বরিশাল নাটক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত