সিন্ধু নদে বাঁধ দিলে হামলার হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

পাকিস্তানে সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে ভারত এই নদের ওপর কোনো স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিলে সেক্ষেত্রে সামরিক হামলা চালাবে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহম্মদ আসিফ এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ভারত যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও। ভারতের সঙ্গে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যেই ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ দাবি করছে, তারা ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম ‘আবদালি’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। এদিকে, পাকিস্তান থেকে সব ধরনের পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। গতকাল শনিবার দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। দুই দশের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম কিনতে যাচ্ছে ভারত। তবে দুই দেশকে বৃহত্তর সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস।

ভারতকে হুঁশিয়ারি

জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সিন্ধু চুক্তি স্থগিত করেছে ভারত। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পাকিস্তানও। এবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ভারতকে সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তানে সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে কোনো বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিলে সামরিক হামলা চালাবে পাকিস্তান। শুক্রবার পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের একটি অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাজা আসিফ। সেখানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। খাজা আসিফ বলেন, শুধু বন্দুকের গুলি বা কামানের গোলা ছুড়লেই আগ্রাসন হয় না। বহুভাবে আগ্রাসন চালানো যায়। যেমন সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া বা পানিপ্রবাহকে ভিন্নপথে চালিত করাও একপ্রকার আগ্রাসন। কারণ এর ফলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কারণে মৃত্যু হবে লাখ লাখ মানুষের। তাই সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ আটকাতে যদি তারা (নয়াদিল্লি) বাঁধ বা এই জাতীয় স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে সেক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই আমরা আঘাত করব এবং সেই স্থাপনা ধ্বংস করব। তবে আপাতত আমরা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি (সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি) নিয়ে আলোচনা করছি এবং নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।

পাক সেনাবাহিনীর সতর্কবার্তা

শুক্রবার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাওয়ালপিন্ডি শহরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কোরের কমান্ডারদের সম্মেলনে (কর্পস কমান্ডারস কনফারেন্সসিসিসি) বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। এ সময় সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বিদ্যমান ভূ-কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা করেন। সেখানে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা এবং বৃহৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্মেলনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করে বলেন যে, যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টার জবাব দেওয়া হবে এবং এই জবাব হবে কঠোর। পাশাপাশি পাকিস্তানের জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতি যেকোনো মূল্যে সম্মান জানানো হবে।

পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা

ভারতের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ দাবি করছে, তারা ৪৫০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমে সক্ষম একটি ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। শনিবার আবদালি উইপন সিস্টেম নামের এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ‘এক্স সিন্ধু’ সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে উৎক্ষেপণ করা হয়। মহড়ায় উপস্থিত ছিলেন আর্মি স্ট্র্যাটিজিক ফোর্সেস কমান্ডার (এএফএসসি), স্ট্র্যাটিজিক প্ল্যান ডিভিশন ও এএফএসসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এবং পাকিস্তানের কৌশলগত সংস্থাগুলোর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা। পাকিস্তানের আইএসপিআর ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানের সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, এই উৎক্ষেপণের উদ্দেশ্য ছিল সেনাদের প্রস্তুতি যাচাই এবং ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত নেভিগেশন ও গতিশীলতা সক্ষমতা নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সামরিক নেতারা এই প্রযুক্তি ও বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়ে পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।

পাকিস্তান থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার পর উত্তেজনার জেরে পাকিস্তান থেকে সব ধরনের পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করল ভারত। গতকাল শনিবার দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। এ নিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত জাতীয় নিরাপত্তা ও জননীতির স্বার্থে নেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, পাকিস্তান থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে আসা সব পণ্য চিকিৎসা সামগ্রী, ফলমূল বা তেলবীজ, যতই অনুমোদিত হোক না কেন, এখন থেকে আমদানি নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞার আগেই ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত বাণিজ্যপথ বন্ধ করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনছে ভারত

ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারতের কাছে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সংক্রান্ত একটি ফাইলে অনুমোদনও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। এসব সরঞ্জামের মধ্যে উন্নত সি-ভিশন সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পরিষেবা রয়েছে। ভারতীয় বার্ত সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতের কাছে বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রিবিষয়ক একটি ফাইলের অনুমোদন দিয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থা বিষয়টি কংগ্রেসকে অবহিত করার কথা জানিয়েছিল। সংস্থাটি বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে এবং ভারতের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা উন্নত করতে সাহায্য করবে। এতে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আহ্বান

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার চলমান উত্তেজনা থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। তবে দুই দেশকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। শুক্রবার আলাদাভাবে দুজনকে ফোন করেন তিনি। এ সময় দিল্লি ও ইসলামাবাদকে তিনি সংযত থাকার এবং উত্তেজনা কমাতে সংলাপে বসার আহ্বান জানান। ভারত ও পাকিস্তানের দুই মন্ত্রীকে কাজা কালাস বলেন, দুই দেশের মধ্যে ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া এই উত্তেজনা ‘উদ্বেগজনক’। পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে এগোলে কোনো দেশের জন্য তা সুফল বয়ে আনবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, আমি দুই দেশকে সংযম দেখানোর জন্য এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে সংলাপে বসার অনুরোধ করছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত