নেতৃত্ব আশীর্বাদ না অভিশাপ লিটনের

আপডেট : ০৭ মে ২০২৫, ১২:০০ এএম

নীলা বা নীলকান্তমণি। মূল্যবান এই রতœপাথর আংটিতে ধারণ করেন জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী অনেকেই। অনেকের ভাগ্যেই নাকি নীলা সয় না, দুর্ভোগ ডেকে আনে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ ব্যানার্জির ‘রক্তমুখী নীলা’ গল্পে তার খানিকটা উল্লেখ মেলে। ক্রিকেটে অধিনায়কত্বও অনেকটা এই নীলার মতোই, কারও ক্যারিয়ারকে বৃহস্পতির তুঙ্গে তুলে দেয় আর কারও আবার শনির দশা টেনে আনে। আগামী বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই সংস্করণে অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে লিটন কুমার দাসকে। যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে তাকে নেতৃত্বে আনা, সেই সফরে ব্যাট হাতে ৩ ম্যাচে তার সংগ্রহ ১৭ রান! নেতৃত্বের টোটকা কি লিটনকে রানে ফেরাবে নাকি আরও ডোবাবে?

নেতৃত্বের ভারটা সফলভাবে নিতে পারেননি শচিন টেন্ডুলকারও। ১৯৯৬ থেকে ২০০০, এই সময়টায় ভারতকে ৯৮টা ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন টেন্ডুলকার, ব্যাটিং গড় কমেছে ৬-এর মতো। এটা যদিও খুব বড় পতন নয় তবে মানসিকভাবে টেন্ডুলকার খুবই অস্বস্তিতে ছিলেন ভারতের অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়ে, তার চেয়ে বরং নিজের খেলা নিয়েই মগ্ন থাকতে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তাই তো স্বেচ্ছায়ই ছেড়ে দিয়েছিলেন অধিনায়কত্ব। রিকি পন্টিংয়ের বেলায় হয়েছে উলটো। স্টিভ ওয়াহ-এর সময়ের সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলকে আরও সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গেছেন পন্টিং, বেড়েছে তার ব্যাটের ধারও। ক্যারিয়ারের ৭১টা সেঞ্চুরির ৪০টাই অধিনায়ক হিসেবে, সাড়ে ২৭ হাজার রানের ভেতর সাড়ে ১৫ হাজার রান করেছেন অধিনায়কের আর্মব্যান্ড নিয়েই। বাংলাদেশ দলে একই সঙ্গে অধিনায়ক এবং দলের সেরা ব্যাটসম্যান, এমন ভূমিকা লম্বা সময় পালন করতে হয়েছে হাবিবুল বাশারকে। অধিনায়ক হিসেবে লিটনের ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, সেই সম্ভাবনার কথা তার কাছে জানতে চেয়েছিল দেশ রূপান্তর। হাবিবুল নির্বাচক থাকার সময়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক লিটনের। সাবেক অধিনায়ক মনে করেন লিটনের জন্য চ্যালেঞ্জটা কঠিন, নেতৃত্বের চাপের প্রভাব আসতে পারে ব্যাটিংয়ে। নির্বাচকরা দল ঘোষণার সময়েই জানিয়েছেন যে লিটন ব্যাট করবেন তিনে। দলের সেরা ব্যাটসম্যান, উইকেটরক্ষক এবং অধিনায়ক; চাপটা তার ওপর বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নে দেশ রূপান্তরকে হাবিবুল বলেছেন, তাকে অধিনায়ক করার আগেও এই রকম প্রশ্ন উঠেছিল, ‘আমাকেও এই কথা বলা হয়েছিল যে অধিনায়ক তো করা হলো, ও তো নিয়মিত রান করে, যদি এটা ফর্মে প্রভাব ফেলে তখন রান না করলে তো দলের জন্য সমস্যা, তার জন্যও সমস্যা। আমাকে অধিনায়কত্ব না দেওয়ার জন্যই এই কথাটা বলা হয়েছিল, যখন অধিনায়কত্ব দেওয়া হয় তখন এই প্রশ্নটা উঠেছিল। আমি তো অধিনায়কত্ব করেছি, সমস্যা হয়নি। তাই আমার মনে হয় না এটা কোনো ইস্যু হবে। আর লিটন তো অধিনায়কত্ব করেছে আগে, সে নেতৃত্বের খুঁটিনাটি সবকিছু জানে। আর পারফরম্যান্স (এর ওপর প্রভাব) ...আমার মনে হয় না তার বেলায় খুব বেশি প্রভাব ফেলবে। এটা আসলে ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। লিটন এটাকে কীভাবে হ্যান্ডেল করবে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় কাউকে যদি অধিনায়ক করতেই হয় তাহলে তাকে লম্বা সময়ের জন্যই করা উচিত। সিরিজ বাই সিরিজ হয় না, অধিনায়ক করলে ১ বা ২ বছরের জন্য করতে হয়। তা না হলে কাউকে অধিনায়ক করার কোনো মানে হয় না। যাকেই দিতে হবে, লম্বা সময়ের জন্যই দিতে হবে।’

নেতৃত্ব ব্যাটিংকে সহজ করে না কঠিন করে এমন প্রশ্নে হাবিবুলের মন্তব্য, ‘না, সহজ করে না। বরং কঠিন করে কারণ অধিনায়কত্ব অনেক সময় বাড়তি বোঝা হয়। অধিনায়কত্ব না থাকলে শুধুই নিজের ব্যাটিং নিয়ে ভাবা যায় তবে অধিনায়ক হলে শুধু নিজের ব্যাটিং না সবকিছু নিয়েই ভাবতে হয়। ক্যাপ্টেনসি অনেক সময় ক্রিকেটটাই কেড়ে নেয় অনেকের জীবন থেকে। তবে তার মানে এই নয় যে সেরা খেলোয়াড় অধিনায়ক হতে পারবে না। রিকি পন্টিং অস্ট্রেলিয়ার সেরা খেলোয়াড় ছিল, সে অন্যতম সেরা অধিনায়ক হয়েছে। ওভাবে দেখলে তো সেরা খেলোয়াড়কেই অধিনায়ক করা উচিত।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মতো দল, যেখানে অধিনায়ককে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রিকেট প্রশাসন; সব জায়গাতেই নিিদ্র ভূমিকা পালন করে যেতে হয়, সেখানে নিজের খেলা নিয়ে মনোযোগ কমে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যেসব কারণে সাকিব আল হাসানও একটা সময়ে নেতৃত্বে থাকতে চাচ্ছিলেন না। সেই কঠিন দায়িত্বটা লিটন নিয়েছেন এমন একটা সময়ে, যখন সাদা বলের ক্রিকেটে তার ক্যারিয়ারে শনির দশা। ওয়ানডে দলে জায়গা হারিয়েছেন, খেলা হয়নি সবশেষ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। ওয়ানডে দলে জায়গা না পাওয়া একজন ক্রিকেটারকে যখন টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ক করা হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে নিরুপায় হয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। নেতৃত্বের বরমাল্য লিটনের জন্য হয়ে উঠতে পারে রক্তমুখী নীলা বসানো হার, যা বদলে দিতে পারে তার ক্যারিয়ারের পরিস্থিতি। তবে সেটা ইতিবাচক না নেতিবাচকভাবে, সেটা বোঝা যাবে আগামী সিরিজেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত