সুস্বাস্থ্য বাংলাদেশের পর্যালোচনা

স্বাস্থ্যখাতের জন্য ‘লিভিং ডকুমেন্ট’, বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমত দরকার

আপডেট : ০৯ মে ২০২৫, ১০:২২ পিএম

স্বাস্থ্য খাত সংস্থার কমিশনের প্রতিবেদনকে দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য ‘লিভিং ডকুমেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে সুস্বাস্থ্য বাংলাদেশ। এটি বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যমত গঠনের কথা বলেছে সংগঠনটি।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন সরকারকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নিতে হবে। তারা যে যে বিষয়ে একমত হচ্ছে সেগুলো সহজে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। সরকারের সময়সীমার মধ্যেই অনেক কাজ শুরু করা যেতে পারে।

শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাত সংস্থার কমিশনের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এই পরামর্শ দেয় সংগঠনটি। তারা এই প্রতিবেদন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে যেকোনো প্রকারের সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান।

সংগঠনের আহ্বায়ক ডা. কাজী সাইফউদ্দীন বেননূর বলেন, প্রতিবেদনের কিছু সুপারিশ নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না। কিছু সুপারিশ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে এই ডকুমেন্ট সবাইকে ধারণ করতে হবে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে কোথা থেকে শুরু করতে হবে। 

সংবাদ সম্মেলনে ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন: আমাদের পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ’ শীর্ষক অবস্থানপত্র পাঠ করেন সংগঠনের সদস্যসচিব শামীম হায়দার তালুকদার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংগঠনের সদস্য ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, সংস্কার প্রস্তাবে চিকিৎসকের কাছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। উদ্যোগটি সঠিক, আদর্শ পরিস্থিতিতে তা–ই হওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা বাস্তবসম্মত, তা ভেবে দেখার অবকাশ আছে।

প্রতিবেদনের ‘নেতৃত্ব, সুশাসন, কর্ম সংস্কৃতি’ অংশ প্রসঙ্গে সংগঠনের মূল্যায়ন হলো, এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারগুলোর জন্য অযথা জটিল প্রক্রিয়া প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সংস্কার আরও সহজ সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অর্জন করা যেত।

সংগঠনটি প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশের প্রশংসা ও সেগুলোর সাথে একমত পোষণ করে। এগুলো হলো- এনজিও, নন-প্রফিট ও প্রাইভেট হাসপাতাল বিভাগ, বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস গঠন, সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা, জরুরী স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক, এনজিও ব্যুরো ব্যতীত সরাসরি তহবিল গ্রহণ, প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততা ও স্বাস্থ্য গবেষণায় সুশাসন।

প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশের ব্যাপারে সংগঠনের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা বলেছেন, ‘আইন, বিধিমালা, নীতিমালা ও কৌশলপত্র’ অংশে  আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন, ২০১১ ও জাতীয় লবণ নীতি, ২০২২ যুক্ত হতে পারে। কারণ বর্তমানে অসংক্রামক রোগগুলোই প্রধান ঘাতক এবং এক্ষেত্রে লবণ বা সোডিয়াম ইনটেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

'বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্য শাসন কাঠামো প্রাতিষ্ঠানীকিকরণ' অংশের ব্যাপারে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য কমিশনের সাথে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এবং ক্লিনিকাল কেয়ার বিভাগ, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স, বাংলাদেশ হেলথ কেয়ার ইন্সুভমেন্ট বিভাগ এবং রেগুলেটরি ওভারসাইট বিভাগের কাজের পার্থক্যও সুস্পষ্ট হতে হবে।

‘স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধান হিসেবে স্বনামধন্য চিকিৎসক’ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির  দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘মেডিকেল এডুকেশন বিভাগ’ অংশের ক্ষেত্রে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ মনে করে, মেডিকেল কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হওয়া উচিত। তবে অ্যাক্রিডিটেশনের ভার স্বাস্থ্য কমিশনের ওপর থাকতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, পাবলিক হেলথ বিভাগের কার্যক্রম খর্বিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই বিভাগের কার্যক্রম বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

প্রতিবেদনে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিভাগ’ সবচেয়ে দুর্বল ও সমস্যাজনক অংশগুলোর একটি বলে মনে করে সংগঠনটি। তাদের মত, অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আইনি কাঠামো বা মেডিকেল কোর্ট গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে বিচারের দায়িত্ব দেওয়া একটা অবাস্তব প্রস্তাব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগঠনের পর্যালোচনায় বলা হয়, বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস বা বিএইচএস-এর কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। বর্তমানে তিনটি সচিবালয়ের জনবল কাঠামো একইভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো সচিবালয়গুলোর কাজের ক্ষেত্র বিবেচনায় ভিন্ন ভিন্ন হওয়া উচিত। এর প্রধান এবং উপপ্রধান মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক বা কেন্দ্রীয় হতে পারেন।

‘হাসপাতাল ভিত্তিক সেবায় সুশাসন’ অংশের ব্যাপারে বলা হয়, একজন রোগী একটা রোগের জন্য একজন চিকিৎসককেই দেখাবে- এতে রোগীর অটোনমি নষ্ট হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। পৃথিবীর প্রায় কোনো দেশেই এটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। 

কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য প্রস্তাবিত ৩৬০ ডিগ্রি পদ্ধতিও অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

সংগঠনের মতে, সরকারি ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে (ইডিসিএল) অসংক্রামক রোগের জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের ঔষধ প্রস্তুতের সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ দ্রুত করা এবং ঘরোয়াভাবে তৈরি ইউনানী, আয়ুর্বেদিক ইত্যাদি ঔষধ প্রস্তুত ও বিক্রির উপর সরকারী ভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণ অব্যহত রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত