মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা টুইট বার্তাটি যখন প্রকাশ পেল, বাংলাদেশের স্থানীয় সময় তখন সন্ধ্যা ৬টা বেজে ৩ মিনিট। তার কিছুক্ষণ আগেই মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে শেষ হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকদের বিশেষ সভা। যেখানে আলোচ্য বিষয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে পাকিস্তানে দল পাঠানো। বিসিবির মিডিয়া বিভাগ থেকে প্রেরিত বার্তায় জানানো হয়েছে, পূর্বনির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর হবে আর পাকিস্তান সফরের ব্যাপারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ট্রাম্পের টুইট বার্তাটি আধঘণ্টা আগে প্রকাশ পেলে হয়তো বিসিবির সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতো। ট্রাম্পের টুইট বার্তার পর ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশের মিলিটারি অপারেশনস বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এর ফলে আশা করা যায় আতঙ্ক কাটিয়ে মাঠে ফিরবে ক্রিকেট।
দুই দেশের ভেতর শুরু হওয়া সংঘাতের জের ধরে বন্ধ হয়ে যায় ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ও পাকিস্তান সুপার লিগ। বিশেষ করে রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামে একটি বিস্ফোরিত ড্রোনের ধ্বংসাবশেষের পতন হলে পাকিস্তানে অবস্থানরত বিদেশি ক্রিকেটাররা হয়ে পড়েন আতঙ্কিত। বাংলাদেশের দুই ক্রিকেটার নাহিদ রানা ও রিশাদ হোসেন এবং পিএসএল-এর সংবাদ সংগ্রহে কর্মরত বাংলাদেশের দুই সাংবাদিককে চার্টার্ড বিমানযোগে দুবাইতে পাঠানো হয় যেখান থেকে তারা বাংলাদেশে ফিরেছেন। বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিশাদ বলেছেন, ‘আতঙ্কিত তো ছিলাম সবাই, ভয় কাজ করছিল। সবাই সাপোর্ট করছিল দেশ থেকে, বিসিবি থেকে অনেক খোঁজখবর নিয়েছে সব সময়। আশপাশে যুদ্ধ হচ্ছে এসব শুনলে পরিবার তো টেনশন করবেই, এটাই স্বাভাবিক। নাহিদ রানা একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল, একটু চুপচাপ ছিল। ওকে বলেছি আমরা দুজন তো আছি, আল্লাহ তো আছেই, সমস্যা নেই।’
রিশাদ-নাহিদদের বিমান টেক অফ করার ২০ মিনিট পর সেই বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। যেটা প্লেনে বসে জানতে পারেন রিশাদ, এই ব্যাপারে তার অনুভূতি, ‘আসলে আমাদের ফ্লাইট টেক অফ করার ২০ মিনিট পর, ওখানে এয়ারপোর্টে একটা মিসাইল পড়সে, তো পড়ার পর আমরা একটু শকড হয়ে গেছি যে...হয়তো বা আল্লাহ ভালো চাইসে বলেই দেশে ফিরায় আনসে, আলহামদুলিল্লাহ।’
রিশাদের কাছেই জানা গেছে, পিএসএলে খেলতে আসা অন্যান্য দেশের ক্রিকেটাররা খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছেন, সবাই দেশে ফেরা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। রিশাদ জানিয়েছেন পিএসএলের বাকি অংশ যদি দুবাইতে হয় তাহলে খেলবেন। জাতীয় দলের হয়ে পাকিস্তান সফরে গেলে ভয় কাজ করবে মনে।
রিশাদ যখন বিমানবন্দরে কথা বলছেন, কাছাকাছি সময়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও উদ্বেগ জানিয়েছিলেন পাকিস্তান সফর নিয়ে। মিরপুরের জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে সাঁতার ফেডারেশনের এক অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সফর ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি, এর মধ্যে কোনো প্রকার ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। পাকিস্তান অ্যাম্বাসি থেকেও আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি জানিয়েছে। বিসিবি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানাবে।’
তবে কিছুক্ষণ পর বদলে গেছে পরিস্থিতি। ট্রাম্পের টুইটে, অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ভারত পাকিস্তান দুই দেশই মেনে নিয়েছে যুদ্ধবিরতি। যা এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি একটি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘ভারত এবং পাকিস্তান দুই পক্ষের মিলিটারি অপারেশনস-এর ডিরেক্টর জেনারেলরা একমত হয়েছেন যে ৫ ঘটিকা থেকে জল স্থল ও আকাশপথে দুই দেশ সব রকমের গোলাগুলি বর্ষণ এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত
থাকবে। দুই তরফেই এই আদেশ স্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ১২ মে ১২০০ ঘটিকায় ডিরেক্টর জেনারেল মিলিটারি অপারেশনস ফের কথা বলবেন।’ উভয় দেশের মধ্যে কোনো দ্বিপাক্ষিক আলাপ বা বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানিয়েছে ভারতের সরকারি সম্প্রচার কর্র্তৃপক্ষ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার টুইট (এক্স) বার্তায় লিখেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতভর দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা শেষে, আমি এই ঘোষণা দিতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত যে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে সম্মত হয়েছে। সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাদের অনেক ধন্যবাদ। এই বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।’
পূর্ণ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়ায় ১ সপ্তাহের বিরতি কাটিয়ে মাঠে ফিরবে আইপিএল, পিএসএলকেও বাকি খেলাগুলো দুবাইতে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। আশা করা যায় সংঘাতের আতঙ্ক কেটে যাবে, মানুষ ফিরবে স্বাভাবিক জীবনে। বাংলাদেশ দলের পাকিস্তান সফরও হবে নির্বিঘেœ।
