ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) শিল্পের উদ্যোক্তাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে প্রস্তাব করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ প্রস্তাবে এসএমই উদ্যোক্তাদের করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ টাকা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এ সীমা ৪ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭ লাখ করার প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানায় এসএমই ফাউন্ডেশন।
মঙ্গলবার ইআরএফ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘এসএমই-বান্ধব বাজেট প্রস্তাবনা ২০২৫-২৬’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাবনার কথা জানানো হয়। ইআরএফের সহযোগিতায় এসএমই ফাউন্ডেশন ও শিল্প মন্ত্রণালয় এ মতবিনিয় সভার আয়োজন করে। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন মো. মুসফিকুর রহমান, বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, ইআরএফের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আশরাফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, আগামী অর্থবছরের বাজেটে দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে নীতি সহায়তা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর-এর কাছে ১৪০টি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসএমই খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পর্যালোচনা করে মূসক সংক্রান্ত ৩১টি, আয়কর সংক্রান্ত ৩৫টি এবং শুল্ক সংক্রান্ত ৬৭টি চূড়ান্ত প্রস্তাব এনবিআরকে দেওয়া হয়েছে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন মো. মুসফিকুর রহমান বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন, যাতে উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে জোরেশোরে কাজ করা যায়।
তিনি বলেন, ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত শিল্পনীতি ২০১৬ ও ২০২২, এসএমই নীতিমালা ২০১৯, এসডিজি ২০৩০, অন্য সরকারি নীতিমালা, কৌশলপত্র ও নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া এসএমই-বান্ধব ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, গবেষণা ও পলিসি অ্যাডভোকেসি, ক্লাস্টার উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আইসিটি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, নারী-উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সহজ শর্তে অর্থায়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে ফাউন্ডেশন।
তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমের সরাসরি সুবিধাভোগী প্রায় ২ লাখ উদ্যোক্তা এবং পরোক্ষ সুবিধাভোগী প্রায় ২০ লাখ মানুষ। তবে ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক জরিপ অনুসারে দেশের ১ কোটি ১৮ লাখ উদ্যোক্তার তুলনায় এই হার খুবই কম। পাশাপাশি এসব উদ্যোক্তার প্রায় ৭০ ভাগ ঢাকার বাইরে। কিন্তু এসএমই ফাউন্ডেশনের ঢাকার বাইরে কোনো কার্যালয় নেই। এমতাবস্থায় দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে আরও বেশি উদ্যোক্তাকে ঋণের আওতায় আনা, এসএমই নীতিমালা ২০২৫ বাস্তবায়ন এবং এসএমই খাত ও উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতি অর্থবছরের বাজেটে এসএমই ফাউন্ডেশনের অনুকূলে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
মুসফিকুর রহমান জানান, বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিরও প্রাণশক্তি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাত। বাংলাদেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৩২ শতাংশ। শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের জিডিপিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান উন্নত দেশগুলো এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক কম। পাকিস্তানে এই হার ৪০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫২ শতাংশ, চীনে ৬০ শতাংশ, ভারতে ৩৭ শতাংশ। বাংলাদেশে এই হার দেশের প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম। ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশের সিএমএসএমই উদ্যোক্তা ৭৮ লাখ ১৩ হাজারের বেশি। জুলাই বিপ্লবের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসএমই নীতিমালা ২০২৫-কে ঘিরে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা আশা করছেন, এই নীতিমালা শতভাগ বাস্তবায়নে সরকার এসএমই ফাউন্ডেশনসহ বাস্তবায়ন সহযোগী মন্ত্রণালয় ও দপ্তরসমূহের অনুকূলে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ প্রদান করবে, যা শতভাগ শ্রমঘন এই খাতকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, জাপান ও জার্মানির মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোতেও উন্নয়নের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে এসএমই খাত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এ খাতের বড় অবদান রয়েছে। বিশেষ করে কৃষির পর সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান রয়েছে এ খাতে। তা সত্ত্বেও এ খাতের উন্নয়নে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হয় না। এমনকি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলেও সংজ্ঞাগত জটিলতার কারণে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাপ্য সুবিধা কাজে লাগাতে পারে না।
