দুষ্কৃতকারীরা মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিকে ‘অবৈধ পন্থা’ হিসেবে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ কথা জানান।
আরিফ হোসেন খান বলেন, নগদে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন এক ব্যক্তিকে যিনি বিপুল আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার আসামি। নগদের আগের বোর্ডে যারা ছিলেন তারা বিপুল আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কোটি কোটি জনগণের সম্পৃক্ততা আছে এবং শত শত কোটি টাকার আমানত এখানে জড়িত। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তে আট সপ্তাহের স্থগিতাদেশ নেওয়া হয় আদালত থেকে। এর ওপর ভিত্তি করে বেআইনিভাবে এমন একজনকে প্রতিষ্ঠানটির সিইও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার আসামি। এসব ব্যক্তিরা অবৈধভাবে ৬৫০ কোটি টাকার ই-মানি তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, নগদের আইটি বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সব ধরনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে এই মুহূর্তে কী হচ্ছে তা নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশ ব্যাংক। বিগত সময়ের মতো অর্থ তছরুপ এবং বেআইনি কর্মকা- হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান মুখপাত্র। তিনি বলেন, আগামী ১৯ মে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চে প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। এর আগে যেসব কর্মকাণ্ড হচ্ছে সেগুলোর বৈধতা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার আসামিদের পুলিশ কেন খুঁজে পাচ্ছে না সে প্রশ্নও তোলেন মুখপাত্র। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ডাক বিভাগকে নগদ পরিচালনার লাইসেন্স দিয়েছে, কিন্তু ডাক বিভাগ কেন দ্বিতীয় পক্ষের হাতে প্রতিষ্ঠানটিকে তুলে দিল।
জানা যায়, গত সপ্তাহে নগদের দায়িত্ব নিয়েছে ডাক অধিদপ্তর। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক দলের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ দেওয়ায় পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডাক অধিদপ্তর। এজন্য ডাক অধিদপ্তরের পরিচালক আবু তালেবকে প্রধান করে আট সদস্যের কমিটি গঠন করে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বনানীর নগদ অফিসে গিয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নগদ পরিচালনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এর মধ্য দিয়ে প্রশাসক দায়িত্ব হারায়। এদিকে নগদের অর্থ তছরুপের জন্য যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক, তাদের মধ্যে একজনকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি হলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক মো. সাফায়েত আলম। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিয়ে তিনি নতুন মানবসম্পদ কর্মকর্তা নিয়োগসহ নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছেন।
নগদের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই ১৯ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার আরও দুই আসামিকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নগদ পরিচালনায় নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার নগদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। প্রশাসক বসানোর পর নিরীক্ষায় উঠে আসে, নগদ লিমিটেডে বড় ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে। ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক অর্থ বা ই-মানি তৈরি করা হয়েছে। এসব কারণে ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না। সাবেক সরকারের আমলে নিয়মের বাইরে গিয়ে গ্রাহক বানানো ও সরকারি ভাতা বিতরণসহ একচেটিয়া সুবিধা পায় নগদ। প্রতিষ্ঠানটিতে যখন এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়, তখন এর পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের একাধিক সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। এ ঘটনায় ২৪ জনকে আসামি করে মামলা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
