সমাজসেবার আর্থিক সহায়তা

‘জীবিতকালে টাকাডা পাইলে আব্বা খুব খুশি হইত’ 

আপডেট : ২৪ মে ২০২৫, ০২:৫৪ পিএম

আর্থিক সহায়তার জন্য সমাজসেবা অফিসে আবেদন করেছিলেন উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের চিতেশ্বরী গ্রামের ইসমাইল হোসেন। তার মেয়ে ইসমত আরা বলেন, ফুসফুস ক্যান্সারে ভুগছিলেন তার বাবা। বিদেশ থেকে বড় ভাইয়ের পাঠানো সব টাকা চিকিৎসার পেছনে খরচ করেও কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না তারা। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ৭ লাখ টাকা সুদে ঋণ নেন। কিন্তু চিকিৎসারত অবস্থায় ২০২২ সালে মারা যায় তার বাবা।

এদিকে ইসমাইল হোসেনের আবেদনের প্রেক্ষিতে এ বছরের ১৩ মে সমাজসেবা অফিস থেকে চিকিৎসা সহায়তা বাবদ তার মেয়ের হাতে ৫০ হাজার টাকার একটি চেক তুলে দেওয়া হয়। ‘জীবিতকালে আব্বা টাকাডা পাইলে খুব খুশি হইত’ বলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ইসমত আরা।

চিকিৎসা সহায়তা চেয়ে ২-৩ বছর পার হওয়ার পর আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন এমন ১০ জনের তথ্য এসেছে এই প্রতিনিধির হাতে,  যাদের প্রত্যেকেই মারা গেছেন। তাদের নামে বরাদ্দ হওয়া চেক সম্প্রতি তাদের ওয়ারিশদের হাতে তুলে দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা অফিস।

জামুর্কী ইউনিয়নের কড়াইল গ্রামের লুৎফর রহমান তালুকদারের মেয়ে ফাতেমা আক্তার বলেন, আমার বড় ভাই কর্মসূত্রে সৌদি আরব গিয়েছিল। কিন্তু সুবিধা করতে না পেরে বাধ্য হয়ে দেশে ফেরত আসে। এমন অবস্থায় ২০২৩ সালে আমার বাবা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যান। একদিকে ধার-দেনা করে ভাইকে বিদেশ পাঠিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ছিলাম। অপরদিকে আমার বাবা স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছিল। তার চিকিৎসা করাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছিলাম। তাই চিকিৎসার জন্য ২০২৩ সালে আবেদন করেছিলাম। ২০২৪ সালের মার্চে আমার বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর বাবার নামে আর্থিক সহায়তা বরাদ্দ হয়। যার জন্য আবেদন করছিলাম এই টাকা যদি তার জন্য খরচ করতে পারতাম তবে একটু শান্তি পাইতাম। এটাই কষ্ট যে, টাকার জন্য ঠিকঠাক মতো বাবার চিকিৎসা করাইতে পারি নাই।

গোড়াই ইউনিয়নের মীর দেওহাটা গ্রামের জুলহাস মিয়া বলেন, তার বাবা মোসলেম উদ্দিন কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২৩ সালে মারা যান। ২০২২ সালের দিকে তার বাবা সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে এ বছরের ১৩ মে তাকে ৫০ হাজার টাকার একটি চেক দেয় সমাজসেবা অফিস।

জুলহাস মিয়া বলেন, বাবার চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ হইছে। সরকারের এই সহায়তা সঠিক সময়ে পেলে কাজে লাগানো যেত।

একইভাবে উপজেলার পেকুয়া গ্রামের শুকুর আলী, ভড়রা গ্রামের কহিনূর বেগম, ধেরুয়া গ্রামের ফুল খাতুন, কামারপাড়া গ্রামের জাহেদা বেগম, গোড়াই গ্রামের আলমগীর হোসেন, পাকুল্যা গ্রামের ওয়াসিম, বাঁশতৈল গ্রামের সুপিয়াদের নামে বরাদ্দ হওয়া আর্থিক সহায়তার চেক তাদের ওয়ারিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকার ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত হতদরিদ্র রোগীদের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এত দিন মন্ত্রণালয়ে সরাসরি আবেদন করার মাধ্যমে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হত। ২০২১ সাল থেকে অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়। 
আবেদনের হার্ড কপি স্ব-স্ব উপজেলা সমাজ সেবা অফিসে জমা দেয়ার পর সেগুলো জেলা সমাজসেবা অফিস হয়ে জেলা সিভিল সার্ভিস সার্জন বরাবর পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও জেলা সমাজ সেবা অফিসারকে নিয়ে ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি রয়েছে। উক্ত কমিটি যাচাই শেষে যাদের মনোনীত করেন তারা এই আর্থিক সহায়তা পান। এই প্রক্রিয়া শেষ হতে ১৫ দিন থেকে ৩ মাস সময় লাগে। সরকার ৩ মাস অন্তর অন্তর এই খাতে বরাদ্দ দিয়ে থাকে।

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোবারক হোসেন বলেন, বছরে উপজেলায় ৪০০-৪৫০ আবেদন জমা হয় কিন্তু বরাদ্দ আসে ১০০-১১০ জনের মতো। এতে বাছাইকৃতদের বরাদ্দ দিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। জেলার পাশাপাশি উপজেলা কমিটি গঠন, সিভিল সার্জন নির্ভর না হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগকে এই কাজে যুক্ত করা গেলে চিকিৎসা সহায়তা দ্রুত ও অধিকতর মুমূর্ষদের বাছাই করা সহজ হতো বলে যোগ করেন তিনি।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল জেলা উপপরিচালক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মূলত চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় এমনটি হচ্ছে। তবে প্রক্রিয়াগত কারণেও কিছুটা বিলম্ব হয়। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি যাতে ভবিষ্যতে চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টি আরও সহজীকরণ করা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত