মেয়র পদে ইশরাকের শপথ প্রস্তুতিতে মন্ত্রণালয়

  • রিটকারীর আইনজীবী চেম্বার আদালতে আবেদন করতে পারেন রবিবার
আপডেট : ২৫ মে ২০২৫, ১২:৫৫ এএম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর প্রক্রিয়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সোমবার (২৬ মে) তাকে শপথ পড়ানো হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 
 
হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে রিটকারীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিলে শপথ পড়ানো আইনি জটিলতায় পড়তে পরে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। 
 
এদিকে ইশরাকের শপথের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ডিএসসিসির নাগরিক সেবায় এক ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। শনিবারও তালাবদ্ধ নগর ভবনে আন্দোলন করেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। মেয়র ছাড়া কোনো কাজ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা। আন্দোলনের কারণে যেন নাগরিক ভোগান্তি না হয়, সেজন্য আন্দোলনকারীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। 
 
মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, গত বৃহস্পতিবার ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপন স্থগিত চেয়ে রিট খারিজ হয়ে যায়। গতকাল সরকার ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে বেশ কয়েক দফা কথা হয়। আজ রবিবার শপথ পড়ানোর ব্যাপারেও আলোচনা হয়। তবে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস কি পদত্যাগ করবেন বা করবেন না, এ নিয়ে সবাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। যে কারণে সোমবার (২৬ মে) শপথের আয়োজন করা হতে পারে। তবে এখনো এ ব্যাপারে দিনক্ষণ ঠিক করে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। 
 
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগ এবং উপদেষ্টা পরিষদে রদবদলের গুঞ্জনে ইশরাকের শপথের বিষয়টা গোলকধাঁধায় পড়ে। তবে এর মধ্যে আদালতের ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত না এলে সোমবারের মধ্যে ইশরাক হোসেনকে ডিএসসিসির মেয়র হিসেবে শপথ পড়ানো হবে। সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন কর্মকর্তারা। 
 
আলাপকালে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালতের রায় আমরা পেয়েছি। সে আলোকে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যেহেতু ২৬ মে’র মধ্যে একটা বাধ্যবাধকতা আছে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন তারিখ চ‚ড়ান্ত করা হয়নি। তবে ২৬ তারিখের মধ্যেই হবে।
 
মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি সূত্র বলছে, আদালতের আদেশে আইনি জটিলতা নিরসন হয়েছে। এজন্য ডিএসসিসির মেয়র পদে ইশরাক হোসেনকে শপথ পড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। সেই লক্ষ্যে ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক শাহজাহান মিয়াকে ওয়াসার এমডি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইশরাককে মেয়র পদে শপথ পড়ানোর পর প্রশাসক শাহজাহান মিয়ার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেবেন। 
 
তবে শপথের বিষয়ে এখনো ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে যোগাযোগ করা হয়নি। গতকাল বিকেলে ইশরাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে শপথের ব্যাপারে এখনো কিছু জানানো হয়নি। জনগণের ন্যায্য অধিকার পেতে আমাদের লড়াই করতে হলো। অথচ এটি স্বাভাবিকভাবেই হওয়ার কথা ছিল।’ 
অন্যদিকে, রিটকারীর আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, চেম্বার আদালতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ও ইসির গেজেট স্থগিত চেয়ে আবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। রবিবার তা দাখিল করা হতে পারে। কার্যতালিকায় এলে রবি বা সোমবার শুনানি হতে পারে। 
 
নাগরিক সেবায় বিপর্যয়
 
গত ১৪ মে থেকে ডিএসসিসি নগর ভবন তালাবদ্ধ করেছেন আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীরা। এর ফলে সিটি করপোরেশনের দাপ্তরিক কাজসহ সব ধরনের নাগরিক সেবা বন্ধ রয়েছে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, বর্জ্য অপসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, কোরবানি পশুর অস্থায়ী হাটের নানা কার্যক্রম থমকে আছে।
 
শনিবারও ভবনের সব কটি ফটকে তালা ঝুলছে। কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ডিএসসিসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নগর ভবনে এসে ফেরত গিয়েছেন। শুধু আসন্ন কোরবানি ঈদ কেন্দ্র করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মালামালের ট্রাক প্রবেশ করেছে। আর করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী নগর ভবনের নিচতলার জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের কক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সিটি করপোরেশনের সচিবসহ অনেকেই এ কক্ষে জরুরি ফাইলপত্র স্বাক্ষর করছেন। 
 
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে নগর ভবনে বাবার মৃত্যুসনদের জন্য এসেছেন লক্ষীবাজারের কামরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে তিন দিন এসে ফেরত গিয়েছি। ভাবছিলাম শনিবার নগর ভবন খোলা থাকবে, কিন্তু এসে দেখি তালা ঝোলানো। বাবার মৃত্যুর পর এক ভাই বিদেশ থেকে এসেছেন। তাই বাবার সম্পত্তি ভাইদের উপস্থিতিতে বণ্টন করতে চাইছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের কারণে পারছি না।’
 
ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলেন, ‘গত কয়েক দিনের মতো গতকালও নগর ভবন তালাবদ্ধ রয়েছে। এতে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’
 
ডিএসসিসি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফ চৌধুরী বলেন, শ্রমিক কর্মচারী ও ঢাকাবাসী একসঙ্গে এই আন্দোলন করছে। সবার দাবি, ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদ বুঝিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। তিনি বলেন, ‘নগরবাসীর সাময়িক সমস্যা হচ্ছে। এজন্য আমরা দ্রুত শপথের ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’ 
 
গতকাল সন্ধ্যায় ইশরাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নগর ভবনে শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। সামনে ঈদ আছে, নগরবাসীর যেন কোনো ভোগান্তি না হয়, এ ব্যাপারে আমি তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। আমরা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলাম। এর মধ্যে শুক্রবার সরকারি ছুটি ছিল। আদালতের আদেশ অনুযায়ী তারা যদি পরবর্তী পদক্ষেপ না নেয়, পরে কী হবে সেটা জনগণই নির্ধারণ করবে।’ 
 
আন্দোলনকারীদের মোবাইল ফোনে নির্দেশনা 
 
আসন্ন কোরবানি ঈদে নগরী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজেদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়েছেন বিএনপি নেতা প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। গতকাল দুপুরে ইশরাক হোসেনের মেয়র হিসেবে শপথের দাবিতে ইশরাক সমর্থক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন শ্রমিক ইউনিয়নের আন্দোলন চলাকালে মোবাইল ফোনে তিনি এই নির্দেশনা দেন।
 
গত বৃহস্পতিবার যমুনার সামনে কাকরাইল মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি তুলে নিয়ে ইশরাক হোসেন সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। তবে এ সময়ের মধ্যে সরকার ইশরাক হোসেনকে শপথের উদ্যোগ না নিলে গতকাল সকাল থেকে নগর ভবনের প্রধান ফটকসহ ভবনের তালা খুলে দেননি ইশরাকের সমর্থক আন্দোলনকারীরা। নগর ভবনের নিচতলায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন। 
 
শ্রমিক ইউনিয়নের অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকাবাসীর সমন্বয়কারী সাবেক সচিব মশিউর রহমানের মোবাইল ফোনে ইশরাক হোসেন উপস্থিত আন্দোলনকারী ও করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশনা দিয়েছেন। 
 
সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইশরাক বলেন, ‘আমরা যেহেতু সরকারকে সময়-সীমা বেঁধে দিয়েছিলাম, মাঝখানে শুক্রবার থাকায় সেদিন কোনো কাজ হয়নি। আমরা আজকে আরেক দিন সময় দেব, এর মধ্যে যার যার কাজ যেটা আছে, সেটা যেন সম্পন্ন করেন।’
 
ইশরাক বলেন, ‘আমার সঙ্গে যখন সব থেকে বড় বৈষম্যটা হলো, তখন সিটি করপোরেশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আমরা একে অন্যের পাশে দাঁড়ালে কোনো অপশক্তি আমাদের গ্রাস করে ফেলতে পারবে না। আপনারা যে কারণে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান পাব।’
 
এ সময় তিনি বলেন, ‘সামনে কোরবানি ঈদ। কোরবানি ঈদ-পরবর্তী নগরীকে বসবাসের উপযোগী করার জন্য গুরুদায়িত্ব আমাদের ওপর, আপনাদের ওপর বর্তায়। নগরী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন যার যে কাজ আছে, সেটি সম্পন্ন করবেন। সরকারের গাফিলতির কারণে নগরবাসীর যাতে কোনো কষ্ট না হয়। এটা আমি আশা রাখি। আর আপনারা যে দাবি নিয়ে আন্দোলন করছেন, সেটির দ্রুত সময়ে ফলাফল পাবেন।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত