সাংবাদিকদের বিএনপি

নির্বাচনের রোডম্যাপ নেই বলে সরকারকে সহযোগিতা কঠিন

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি করে এসেছি। এই সর্বোচ্চ জনআকাক্সক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানতম এজেন্ডা হওয়া উচিত বলে জনগণ মনে করে। এর অন্যথা হলে জনগণের দল হিসেবে বিএনপির পক্ষে সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।’

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোশাররফ এসব কথা বলেন। গত ২৬ মে রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকের আলোচনার ফল সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

ড. মোশাররফ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার আলোচনার প্রসঙ্গে তার প্রেস সচিবের মাধ্যমে সরকারের যে বক্তব্য পাওয়া গেছে তাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন রোডম্যাপের ঘোষণা না থাকায় আমরা হতাশ হয়েছি। বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল কোনো সময়েই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চায়নি এবং এখনো চায় না।’

তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি শুধু এই কয়েকদিন নয়, এটা আগে থেকেই বলছি। ডিসেম্বরকে আমরা মনে করছি, নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময়। সেজন্য আমরা ডিসেম্বরের কথা বলেছি। এখনো আমরা সেই কথার মধ্যেই আছি। ডিসেম্বরের পরে রোজা চলে আসবে, তারপরে বর্ষা, তারপর এসএসসি-এইচএসসির মতো বড় বড় পাবলিক পরীক্ষা আছে। ওই মাসগুলো কিন্তু নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময় নয়। অতীতে যত নির্বাচন হয়েছে কেবল একটি নির্বাচন বাধ্যবাধকতা থাকাতে জুন মাসে হয়েছিল। এ ছাড়া প্রায় সব নির্বাচনই ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি এই সময়টাতেই হয়েছে।’

ড. মোশাররফ বলেন, ‘আমরা সংস্কারের পক্ষে। এ সরকার আসার আগেই আমরা ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমরা ওয়াদা করেছি, জনগণ যদি আমাদের ক্ষমতায় বসায় তাহলে আমরা ৩১ দফার কর্মসূচির ভিত্তিতে সংস্কার করব। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইচ্ছা করলে ওমুক দিন ওমুক সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করা যাবে এটা কেউ বলতে পারে না। ঠিক একইভাবে নির্বাচনকে বিলম্বিত করার জন্য কিছু উছিলা বের করা হচ্ছে। যেমন বিচার শেষ করতে হবে। আমরাও তো বিচার চাই। এই আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে তারা আমাদের নিশ্চিহ্ন করতে কি করে নাই। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, গুম-খুন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে কেউ বাকি নাই। যারা আমরা মিথ্যা মামলার আসামি ছিলাম, বিভিন্ন সময়ে জেল খাটি নাই? এরপরে কেন প্রশ্ন আসে, আমরা তাদের বিচার চাইব না?’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি তাদের বিচার চায়। কিন্তু বিচার হতে হবে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার মধ্যে। স্বাধীন বিচার চাইলে আবার ওমুক দিনের মধ্যেই বিচার করতে হবে, এটা সাংঘর্ষিক। সেজন্য আমরা বলছি, এই সংস্কার, নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও বিচারের প্রক্রিয়া এই তিনটা কাজই একসঙ্গে চলতে পারে এবং সেটা চলা উচিত।’

ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয় ক্ষমতার নাগালের মধ্যে রাখতে, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতিশীলতা আনতে সরকার ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, এই প্রত্যাশা সবার।’

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের বিবৃতি বিভ্রান্তিকর জানিয়ে বিএনপি নেতা বলেন, ‘গত ২৪ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভা শেষে উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে যে বক্তব্য জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে তা অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর। উপদেষ্টা পরিষদের দায়িত্ব পালনে আমরা প্রথম থেকে অদ্যাবধি সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করে আসছি। সরকার পরিচালনায় নিরপেক্ষতার ঘাটতি এবং দুর্বলতার কারণে জনমনে সংশয় ও সন্দেহের উদয় হওয়া স্বাভাবিক। বিভিন্ন মহলের অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি-দাওয়া এবং এষতিয়ারবহির্ভূত বক্তব্যে সরকারের স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার যে অভিযোগ সরকার থেকে উত্থাপন করা হয়েছে, সেটা মূলত সরকারেরই নিজস্ব অর্জন।’

তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারের ওপর দায়িত্ব পালনকে অসম্ভব করে তোলা হচ্ছে’। আমরা বলতে চাই, যথাশিগগির একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই পরাজিত শক্তির ইন্ধন এবং বিদেশি ষড়যন্ত্র বন্ধ করা সম্ভব। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রদান করা জরুরি, এর কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছি। সরকারের স্বকীয়তা, সংস্কার উদ্যোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো কর্মকা- আমরা সব সময়ে নিরুসাহিত করি এবং প্রতিরোধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। অথচ উপদেষ্টা পরিষদের বিবৃতিতে কোনো কোনো মহল তাদের ওপরে অর্পিত দায়িত্ব পালন অসম্ভব করে তুলছে মর্মে একটি বিমূর্ত অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ইশরাক হোসেনের পক্ষে আদালতের রায় অনুযায়ী গেজেট নোটিফিকেশন হয়েছে। অথচ সরকার আজ পর্যন্ত তার শপথগ্রহণের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা আশা করি, কালবিলম্ব না করে সরকার তার শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা নেবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত