সরকার একটি সিদ্ধান্ত জোরালোভাবে গ্রহণ করেছে। তা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ভুক্ত হবে। জাতিসংঘ থেকে আগেই এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সরকারও বলছে যে, তারা এটিকে ধরেই সামনের দিকে এগোতে চায়। সে হিসেবে আমাদের হাতে সময় আছে, দেড় বছরেরও কম। এই সময়টাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জোরালো প্রস্তুতি প্রয়োজন। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করার আবশ্যকতা দেখা দেয়। তাছাড়া যেসব দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করেছে, তাদের সবার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ একটি কৌশলপত্র প্রণয়নের বিষয়ে সুপারিশও করেছে। যে কৌশলপত্রটিকে বলা হচ্ছে Smooth Transition Strategy (STS) বা মসৃণ রূপান্তর কৌশল। বাংলাদেশ সরকার এমন একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে কৌশলপত্রটির সঠিক বাস্তবায়নের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারের সর্বোচ্চ মহল তথা প্রধান উপদেষ্টা নিজে এই কৌশলপত্র বাস্তবায়নের বিষয়টি দেখভাল করছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়টিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
এই কৌশলপত্রটি বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি কমিটি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই একটি কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন। এলডিসি বিষয়ে বড় যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়ে, সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা দেখভাল করেন। এর বাইরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে আরও একটি কমিটি করা হয়েছে। যে কমিটির দায়িত্ব হচ্ছে, এলডিসি বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যে প্রকল্পের আওতায় এসটিএস বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। মোটা দাগে এই তিনটি ধাপে কৌশলপত্রটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন এসটিএস বাস্তবায়নের ইচ্ছা এবং প্রকৃত বাস্তবায়নের মধ্যে কোনো ব্যবধান থেকে যাচ্ছে কি না, সে বিষয়টি একটু খতিয়ে দেখা দরকার। এসটিএস বাস্তবায়নের ইচ্ছা বা অভিপ্রায় নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ নেই। সরকারের সর্বোচ্চ মহল এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবায়ন অগ্রগতি কতটুকু হলো, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিষয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে। এই বিশেষজ্ঞদের কাজ হচ্ছে, এলডিসি থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার, সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেটা ধরিয়ে দেওয়া। কৌশলপত্রের বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা নিজে এরই মধ্যে দুটি সভা করেছেন। কৌশলপত্রে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কর্মপরিকল্পনাগুলো পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করা হচ্ছে, কোন উদ্যোগগুলো আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। এই কর্মপরিকল্পনার মধ্যে পাঁচটি বিষয়কে অত্যন্ত জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা এক জায়গা থেকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের সব ধরনের সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা। এটিকে ত্বরিতভিত্তিতে বাস্তায়নের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এটি বাস্তবায়ন করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টি করা সহজ হবে। কেবল বিদেশি বিনিয়োগকারী নন, দেশীয় বিনিয়োগকারীরাও এ থেকে সুবিধা পেতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, কৌশলপত্রে একটি জাতীয় শুল্ক নীতি বা ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি (এনটিপি) প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে কোনো দেশের সঙ্গে যদি আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হয়, তাহলে এই এনটিপি দরকার হবে। কারণ এটির সঙ্গে শুল্কহারের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাছাড়া আমাদের রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা দেওয়ার বিষয় রয়েছে। সব খাতের রপ্তানিকারকদের জন্য বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা নেই। যারা ওয়্যারহাউজ সুবিধা পান না, তাদের শুল্ক পত্যর্পণ দপ্তরে (ডেডো) যেতে হয়। কিন্তু এই দপ্তরে সেবা পাওয়া কষ্টসাধ্য। যে কারণে উদ্যোক্তারা সেখানে যেত চান না। তাই এনটিপিতে একটি প্রবিধান যুক্ত করা হয়েছে। তা হচ্ছে কোনো রপ্তানিকারক যদি রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক পণ্য বিভিন্ন শুল্ক দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করেন, তাহলে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির পর ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি করা উইনপুট হিসেবে প্রদর্শন করে তার ওপর পূর্বে পরিশোধ করা শুল্কের অর্থ ফেরত নিতে পারবেন। অর্থাৎ, যে শুল্ক রপ্তানিকারকরা আগের স্তরে পরিশোধ করবেন, পণ্য রপ্তানির পর সেটা তারা ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে ফেরত নিতে পারবেন। এনটিপিতে শুল্কের যৌক্তিকীকরণের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। আমাদের যে এনটিপি আছে, সেটি যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে অনেকগুলো উদ্বেগ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে অনেক উচ্চশুল্ক আছে, সেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় যৌক্তিকীকরণ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে কিছু কিছু বিষয়ে এত বেশি উচ্চশুল্ক রয়েছে, যা পরিশোধ করে কেবল দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব। এত উচ্চশুল্কে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। ফলে উৎপাদকরা মনে করেন, দেশের বাজারে বিক্রি করাই তার জন্য বেশি লাভজনক। তখন তারা রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ করা হলে এ সমস্যার সমাধান হবে। তবে শুল্কহার যৌক্তিকীকরণ মানে এটাও নয় যে, কোনো শুল্ক থাকবে না। অবশ্যই স্থানীয় শিল্পের জন্য সংরক্ষণ সুবিধা থাকতে হবে। কিন্তু সেটি একটি যৌক্তিক পর্যায়ে থাকলে তা রপ্তানির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই আমদানি শুল্ক (সিডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি), নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) ইত্যাদি শুল্কের যৌক্তিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এসব শুল্কের বর্তমানে যে গড়পড়তা প্রয়োগ দেখা যায়, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তৃতীয়ত, এসটিএসের আওতায় একটি জাতীয় লজিস্টিকস পলিসি প্রণয়ন করা হয়েছে। কম খরচে ব্যবসা করা বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের সঙ্গে লজিস্টিকসের বিরাট সম্পর্ক রয়েছে। পৃথিবীতে যেসব দেশ রপ্তানি খাতে ভালো করেছে তাদে বৈশিষ্ট্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে এমন জায়গায় শিল্প স্থাপন করা হয়েছে যেখানে সমুদ্রবন্দরের নৈকট্য রয়েছে। যাতে সহজে বন্দরে পণ্য পরিবহন করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। চট্টগ্রামে কিছু শিল্পকারখানা হয়েছে ঠিক, কিন্তু সিংহভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার অবস্থান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর অঞ্চলে। যা সমুদ্র উপকূল থেকে অনেক দূরে। যে কারণে এখানে লজিস্টিকসের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে পণ্য চট্টগ্রামে নিয়ে যেতে হবে, আবার চট্টগ্রাম থেকে কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য এসব অঞ্চলে আনতে হবে। যে কারণে কী কী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করলে ব্যবসার খরচ কী হারে কমবে, সে বিষয়ে লজিস্টিক নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি ভালো লজিস্টিক নীতির বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে পারলে, তার একটি বড় ইতিবাচক প্রভাব সমগ্র বাণিজ্য ক্ষেত্রে প্রতিভাত হবে এবং রপ্তানিকারকরা অনেক খরচ বাঁচাতে পারবেন। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে কোনো কোনো দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে লজিস্টিকসে যদি ব্যয় কমানো যায়, তাহলে কোনো একটি বাজারে শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হলেও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা যাবে।
চতুর্থত, যে বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে তা হচ্ছে চামড়া শিল্পে সুশাসন। বিশেষ করে সাভারে যে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপন করা হয়েছে, সেটা পরিবেশসম্মতভাবে চলছে না। সেখান কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) অকার্যকর হয়ে রয়েছে। ফলে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। কাজেই সিইটিপি যাতে পুরোপুরি কার্যকর করা হয়, সে বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমরা মনে করি, চামড়া শিল্প থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ খাতের রপ্তানি বাড়ানো দরকার এই কারণে যে, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। কেবল তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না।
বর্তমানে চামড়া শিল্পনগরীতে পরিবেশগত সুশাসন না থাকায় যে সমস্যা হচ্ছে তা হলো, স্থানীয় পর্যায়ে আমরা যে প্রক্রিয়াজাত চামড়া উৎপাদন করি, তা দিয়ে তৈরি কোনো পণ্য উন্নত বিশ্বে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। সিইটিপি কার্যকর করার মাধ্যমে আমরা যদি পরিবেশসম্মতভাবে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করতে পারি, তাহলে একটি বড় বাজার আমরা ধরতে পারব।
পঞ্চমত, ওষুধ শিল্পের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ ওষুধ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত। এ শিল্প থেকে রপ্তানির বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে, পাশাপাশি ওষুধের স্থানীয় বাজারও বেশ বড়। ওষুধের দেশীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ পূরণ করছেন স্থানীয় উৎপাদনকারীরা। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইগ্রিডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদনের জন্য মুন্সীগজ্ঞের গজারিয়ায় একটি এপিআই শিল্পপার্ক স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এ শিল্পপার্কটি কার্যকর হয়নি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যদি এপিআইয়ের দাম বাড়ে, তাহলে তখন ওষুধের দামও বেড়ে যেতে পারে। যে কারণে দেশীয় এপিআই শিল্পপার্ক কার্যকর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সেটা করা গেলে এপিআইয়ের স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলটা মজবুত থাকবে। ফলে স্থানীয় বাজারে ওষুধের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিও করা যাবে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী রূপান্তর কৌশলে উপরোক্ত বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি বাজারকে টার্গেট করে বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিষয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ তাদের বাজারে যে সুবিধা পায়, তা পরবর্তী তিন বছর তারা অব্যাহত রাখবে। অর্থাৎ, ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই বাজার দুটিতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তিন বছর তথা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাজ্য তাদের বাজারে বাংলাদেশের জন্য এলডিসি সুবিধা অব্যাহত রাখবে। আর ২০২৯ সালের পরে বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যে দেশটি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেবে। তবে তখন তাদের রুলস অব অরিজিনে পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনের ফলে পণ্যের একক রূপান্তরের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। যেমন বর্তমানে বাংলাদেশ অন্য দেশ থেকে কাপড় কিনে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করে। এমন অবস্থায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশ যদি নিজেই কাপড় তৈরি করে সেটি দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করে, তাহলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে ইউ শর্ত পরিবর্তনের সুযোগ যে নেই, তা নয়। সে জন্য যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এখন থেকেই দেনদরবার শুরু করতে হবে, যাতে তারা এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান সুবিধা অব্যাহত রাখে। কারণ যুক্তরাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমাদের মোট রপ্তানির ৮-১০ শতাংশ এই বাজারে সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিদ্যমান বাজার সুবিধা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু তারপর কী হবে? ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান আইন কাঠামো অনুযায়ী, কোনো দেশ এলডিসিভুক্ত না হলে তারা সেখানে জিএসপি প্লাস সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারে। জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে। এটির জন্য ৩২টি আন্তর্জাতিক সনদ (কনভেনশন) অনুস্বাক্ষর করে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হয়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে এসব সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে। কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোনো দেশের নির্দিষ্ট পণ্যের মার্কেট শেয়ার যদি বড় হয়, তাহলে সেই পণ্যের ক্ষেত্রে একটি ‘সেফগার্ড’ পদক্ষেপ আরোপ করতে পারে ইইউ কর্তৃপক্ষ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের মার্কেট শেয়ার অনেক বড়। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের ওপর এটি আরোপের সুযোগ রয়েছে। সুতরাং সে সময় আমরা জিএসপি প্লাস সুবিধা পেলেও তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা পাওয়া যাবে না। অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে হয়তো পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রেও আলাপ-আলোচনা ও দেনদরবারের ভূমিকা রয়েছে। আমরা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও নমনীয় নীতির দিকে নিতে পারি কি না, সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এখানে একটা সুযোগ রয়েছে। তা হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান নীতি ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তারপর নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দরকষাকষি করে আমরা যদি বিদ্যমান সুবিধাগুলো ধরে রাখতে পারি, তাহলে এলডিসি উত্তরণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের যে ভীতি রয়েছে, তা অনেকখানি প্রশমন করা সম্ভব হবে। আমাদের মোট রপ্তানির ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। ফলে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে যদি আমরা বিদ্যমান সুবিধা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ রপ্তানি বাজার নিশ্চিত হয়ে যায়।
এর বাইরে জাপান বাংলাদেশের একটি বড় বাজার। সেখানেও তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। তাছাড়া দেশটির সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়টি অগ্রসর হচ্ছে। জাপানের সঙ্গে এফটিএ করতে পারলে দুই ধরনের সুবিধা হবে। প্রথমত, বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো দ্বিপক্ষীয় এফটিএ নেই। ফলে জাপান যেহেতু উন্নত দেশ, তাই তাদের সঙ্গে এফটিএ করতে পারলে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে। ফলে অন্যরাও বুঝতে পারবে যে, বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে এফটিএ করতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত, এটি করা গেলে বাংলাদেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
কৌশলপত্রে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের জন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। যেমন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া, বাজেট ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্র সাধনের উদ্যোগ, বিনিময় হারে শৃঙ্খলা আনয়ন ইত্যাদি। তবে যে ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি তা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংহতকরণ বা রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। আমাদের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ এখনো অনেক কম।
এলডিসি থেকে উত্তরণের পরে অনেকগুলো কারণে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দরকার পড়বে। প্রথমত, বাংলাদেশ যদি কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে চায়, তাহলে আমদানির ওপর থেকে শুল্ক কমাতে হবে। আর আমদানি শুল্ক কমাতে হলে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ অন্যান্য উৎস থেকে রাজস্ব বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারের অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা বা ফিসক্যাল স্পেস বাড়াতে হবে। ফিসক্যাল স্পেস সংকুচিত থাকলে সরকারের দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়। কারণ এতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হ্রাস পায়। তাছাড়া বর্তমানে বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় বিদেশি ঋণ পরিশোধ করার জন্য বাড়তি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে। আর বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণও যথেষ্ট নয়। ফলে সরকারের হাতে যদি পর্যাপ্ত টাকা না থাকে, তাহলে বাড়তি ডলার কিনবে কীভাবে? সে জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আরেকটি যে কাজ করতে হবে তা হচ্ছে দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সেটা করতে না পারলে আমাদের উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না। কীভাবে দক্ষতা উন্নয়ন করলে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়বে, সে বিষয়ে কৌশলপত্রে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। এ কাজের জন্য স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। কাজেই রাজস্ব আহরণ করে অর্থের জোগান বাড়াতে না পারলে এ কাজগুলো করা সম্ভব হবে না।
রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এতদিন বিভিন্ন দেশে প্রাপ্ত বাণিজ্য সুবিধা ও সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করেছে। মধ্য মেয়াদে এটি দিয়ে হয়তো চলা যাবে। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আর এভাবে চলা সম্ভব হবে না। বাণিজ্য সুবিধা প্রাপ্তি, সস্তা শ্রম ও কমপ্লায়েন্স অনুসরণ না করে ব্যবসার খরচ বাঁচানো কোনো ভালো কৌশল হতে পারে না। এটিকে বলা হয় গতিহীন পথ। তবে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং দেনদরবার করে যদি বাণিজ্য সুবিধা অব্যাহত রাখা যায়, সেটি একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে। আর কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করা হলে এমনিতেই আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠী বাংলাদেশে আসার বিষয়ে আগ্রহী হবে। এ বিষয়টিকে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাইওয়ে বলে থাকি। কৌশলপত্রে এই হাইওয়ের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যদি শ্রমিকদের মজুরি ঠিকমতো পরিশোধ না করা হয় এবং কর্মপরিবেশ উন্নত না হয়, তাহলে বিদেশিরা আমাদের পণ্য কিনবে না।
পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির বড় মাত্রার পরিবর্তন হয়েছে। সেখান থেকে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সেই চাপ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশে আনার উদ্যোগ গ্রহণ, মার্কিন নীতির পরিবর্তন মোকাবিলা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এলডিসির সুবিধা ধরে রাখার জন্যও এই দরকষাকষির সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য এই কৌশলপত্রের মধ্যে একজন প্রধান বাণিজ্য নেগোশিয়েটরের পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে। যার অধীনস্ত দপ্তর সার্বিক দরকষাকষির কাজ সম্পন্ন করবে। এই দপ্তরে বিভিন্ন কার্যালয় থেকে যারা দরকষাকষি ভালো বোঝেন, তাদের এনে একটি নেগোশিয়েটর পুল প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে। এই নেগোশিয়েটরদের আরও নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে ভালো নেগোশিয়েটররা এখানে আসতে আগ্রহী হন, সে রকম একটি পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলো সহজাতভাবেই নানা বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে। যে কারণে এতদিন দরকষাকষির বিষয়টি এতটা গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা আদায় করতে হলে দরকষাকষির কোনো বিকল্প নেই। সে জন্যই একটি পৃথক দপ্তর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে একটা চাপের মধ্যে পড়বে, এটা ঠিক। বিশেষ করে বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা কঠিন কাজ হবে। কিন্তু আমরা যদি ভবিষ্যতের বৃহত্তর উন্নয়নের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখা যায় যে, এসব উদ্যোগ কোনো না কোনো সময় আমাদের বাস্তবায়ন করতেই হবে। ফলে এলডিসি থেকে উত্তরণ উপলক্ষে যদি আমরা ভবিষ্যতের প্রস্তুতিটা নিতে পারি, তাহলে সেটি খুবই ফলদায়ক হবে। সেই বিবেচনায় এলডিসি থেকে উত্তরণ একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য একটি বড় ধরনের সুযোগও বটে।
লেখক : চেয়ারম্যান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)
