গত বছর জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা বৈষম্য বিলোপের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের সব স্তরে বৈষম্য দূর করা। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট এই বৈষম্যবিরোধী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ : সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সিপিডি এই বাজেটের পর্যালোচনা তুলে ধরে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এ সময় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অন্য গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন নেই। পুরনো কাঠামোর মধ্যেই এখানে-সেখানে সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বাজেটে বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলা হলেও বাস্তব পদক্ষেপগুলো তা পুরোপুরি প্রতিফলিত করেনি।’
সিপিডি জানায়, আয়-ব্যয়ের ফারাক, কর আদায়ে দুর্বলতা, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং মানব উন্নয়ন খাতে অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে বাজেট বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির তুলনায় বরাদ্দ কমে ১.৫৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা এলডিসি দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় সর্বনিম্ন। স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন বরাদ্দও ১৩ শতাংশ কমানো হয়েছে। সিপিডির মতে, মানব উন্নয়নের জন্য এ দুই খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ দরকার।
ড. ফাহমিদা বলেন, নতুন আয়কর কাঠামো মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা বাড়িয়েছে, যা অপ্রত্যাশিত। উদাহরণস্বরূপ, বার্ষিক আয় ৬ লাখ টাকায় কর বেড়েছে ১২.৫ শতাংশ, ১০ লাখ টাকায় ১৬.৭ শতাংশ, ১৫ লাখ টাকায় ১৬.৭ শতাংশ এবং ৩০ লাখ টাকায় ৭.৬ শতাংশ। এ বিষয়গুলো আরও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল।
তিনি বলেন, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে ভৌত অবকাঠামোর জন্য ভালো বরাদ্দ থাকলেও মধ্যমপর্যায়ের করদাতাদের ওপর বেশি চাপ পড়বে। তুলনায় উচ্চ পর্যায়ের করদাতাদের ওপর চাপ কম। এ ছাড়া, অঞ্চল নির্বিশেষে ৫ হাজার টাকার করসীমা বৈষম্যমূলক, কারণ ঢাকা এবং অন্যান্য জেলায় সেবার সুযোগ সমান নয়। শিল্প খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও কিছু শিল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চাপে পড়বে। ব্যবসা পরিচালনার খরচ বাড়বে, যা মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ঋণ এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালকের মতে, বাজেটে মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায় নিয়ে অতি উচ্চাকাক্সক্ষী প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা অর্জন করা কঠিন। তিনি বলেন, বাজেটের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট। এতে সামগ্রিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি।
তবে কর হ্রাস, কর অবকাশ, বরাদ্দ বৃদ্ধি ও প্রণোদনার মতো পদক্ষেপকে তিনি বাজেটের ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। শুধু খণ্ডিতভাবে বরাদ্দ বাড়ানো বা কমানোর মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, অর্থনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সমস্যা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। কর কাঠামোর ছয়টি শ্রেণিতে নিম্নবিত্তের ওপর বেশি এবং উচ্চবিত্তের ওপর কম কর আরোপিত হচ্ছে, যা বৈষম্যমূলক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অর্থ উপদেষ্টা বাজেটের প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে জনমুখী করবেন এবং কালো টাকা বৈধ করার মতো নেতিবাচক পদক্ষেপ প্রত্যাহার করবেন।
এদিকে, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, কালো টাকা বৈধ করার প্রস্তাব এবং অর্থপাচার নিয়ে নীরবতা সরকারের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, অর্থপাচার রোধে সরকারের কিছু পদক্ষেপ প্রশংসনীয়, তবে বাজেটে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল। উচ্চ হারে কালো টাকা বৈধ করার প্রস্তাব সরকারের নীতির সঙ্গে বৈপরীত্য সৃষ্টি করে।’
