বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল শুরু হচ্ছে রাত পোহালে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া নামবে টানা দ্বিতীয়বার শিরোপা জেতার লক্ষ্য নিয়ে। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স লর্ডসের ঐতিহাসিক গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে ক্যারিয়ারের উত্থান-পতন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলেন গার্ডিয়ানের সঙ্গে। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য আর সৎ খেলায় সাফল্যের প্রতিফলন পাওয়া গেছে। জানিয়েছেন তিনি অন্তত আরও ৫ বছর খেলতে চান। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য এই সাক্ষাৎকার অনুবাদ করা হলো।
প্রশ্ন: বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। লর্ডসে দাঁড়িয়ে, এই মুহূর্তে অনুভূতিটা কেমন?
কামিন্স: লর্ডস সবসময়ই একটা আবেগের জায়গা। আর দক্ষিণ আফ্রিকা আমার ক্যারিয়ারের অনেক বড় অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত। ২০১১ সালে টিনএজার হিসেবে তাদের বিপক্ষেই প্রথম সফরে যাই। তখন খেলিনি, কিন্তু ড্রেসিংরুমে থাকার অভিজ্ঞতা ছিল অনেক শিক্ষণীয়। এখন তাদের বিপক্ষে ফাইনালে নেতৃত্ব দেওয়ার অনুভূতিটা একটু আলাদা।
প্রশ্ন: সেই ২০১১ সালের সফরেই তো কেপটাউনে সেই ম্যাচ হয়েছিল যেখানে অস্ট্রেলিয়া গুটিয়ে যায় মাত্র ৪৭ রানে...
কামিন্স: হ্যাঁ, ম্যাচটি ছিল টানটান উত্তেজনার। আমি তখন দ্বাদশ খেলোয়াড়, ফিল্ডিংয়ে এসেছিলাম দুই ওভারের জন্য। একটা বল ধরতেই পারিনি, এতটাই নার্ভাস ছিলাম। তখনই টের পেলাম, টেস্ট ক্রিকেট কতটা কঠিন।
প্রশ্ন: এরপরই তো জোহানেসবার্গ টেস্টে অভিষেক—আর সেই ম্যাচেই ম্যাচসেরা!
কামিন্স: হ্যাঁ, অবিশ্বাস্য এক অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তিদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ—গ্রায়েম স্মিথ, জ্যাক ক্যালিস, হাশিম আমলা, ডেল স্টেইন... আমি যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এক পর্যায়ে ভাবছিলাম, আমি এখানে কীভাবে এলাম?
প্রশ্ন: কিন্তু অভিষেকের পর পাঁচ বছরের দীর্ঘ বিরতি...
কামিন্স: সেটাই আমাকে পরিপক্ব করেছে। হঠাৎ করে অনেক কিছু পেয়ে গিয়েছিলাম, এরপর ইনজুরি, হতাশা। নিজেকে প্রশ্ন করতাম—এই আমি কী আদৌ যথেষ্ট ভালো? মাঝে মাঝে মনে হতো, বুঝি অন্য কোনো পেশা খুঁজে নিতে হবে। তবে সময় শিখিয়েছে ধৈর্য, শিখিয়েছে ধারাবাহিকতা।
প্রশ্ন: পরিবার আপনাকে কতটা সাহায্য করেছে?
কামিন্স: অনেক। আমার মা সবসময় চাইতেন আমি যেন মাথা ঠান্ডা রাখি। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরের কাছে পার্কিং স্পট চেয়েছিলাম। মা জানতে পেরে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছিলেন—"তুই নিজেকে কী ভাবিস?" বলেছিলেন তাকে ক্ষমা চেয়ে ইমেইল করতে।
প্রশ্ন: আজকের কামিন্স অনেক পরিণত, অনেক সফল। কিন্তু সেই ২০১৮ সালের ‘স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি’ কি এখনও আপনাকে তাড়া করে?
কামিন্স: (একটু থেমে) ওই ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই না। এটা অতীত। তবে এটা ঠিক, ওই ঘটনার পর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। আমরা এখন ‘হার্ড অ্যান্ড ফেয়ার’ খেলতে চাই। আমার মনে হয়, সেই পথে ঠিকই এগোচ্ছি।
প্রশ্ন: লর্ডসে বেয়ারস্টোর রানআউট নিয়ে এখনও বিতর্ক হয়। আপনি বলেছিলেন—‘আউট তো আউট, আর কি বলার আছে।’ এখনও কি একই মত?
কামিন্স: অবশ্যই। ব্যাটসম্যান যদি সতর্ক না থাকে, সেটা তার দায়। আবেগের বাইরে গিয়ে ভাবলে এটা খুবই সাধারণ একটা আউট।
প্রশ্ন: মাইকেল ভন বলেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা এই ফাইনালে খেলার যোগ্য নয়...
কামিন্স: আমি একমত নই। আপনি যাদের বিপক্ষে খেলেন, তাদের হারাতে হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। ওদের বোলিং লাইনআপ এখনো বিশ্বমানের।
প্রশ্ন: অধিনায়ক হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
কামিন্স: যখন দল খারাপ সময় পার করে, তখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হয়। মিডিয়ার সামনে আসা, দলের মনোবল ধরে রাখা—সবকিছু সামাল দিতে হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে এসব মুহূর্ত খুব বেশি আসেনি।
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার দলে কি একটি যুগের অবসান ঘটছে?
কামিন্স: সম্ভবত, হ্যাঁ। অনেকেই এখন ত্রিশ পেরিয়েছে। তবে আমরা নতুন মুখ পেয়েছি, যারা ভরসা জোগায়। তাই পরিবর্তনের ধাক্কাটা হয়তো অতটা কঠিন হবে না।
প্রশ্ন: টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কি চিন্তা আছে?
কামিন্স: অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট ক্রিকেট এখনো জনপ্রিয়, কিন্তু বিশ্বজুড়ে তা নয়। আমি চাই, সব টেস্ট খেলুড়ে দেশেই টেস্ট ক্রিকেট টিকে থাকুক। কিন্তু সেটা হবে না, যদি আমরা উদ্যোগ না নিই। হয়তো ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জন্য নির্দিষ্ট সময় রেখে টেস্টকে বাঁচানো যেতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি নিজে আর কতদিন খেলতে চান?
কামিন্স: আরও অন্তত পাঁচ বছর। আমি এখনো ভালো অনুভব করছি। দারুণ একটা দল, দারুণ একটা দায়িত্ব—আমি আরও খেলতে চাই, জিততে চাই, আর সেই সঙ্গে উপভোগ করতে চাই প্রতিটি মুহূর্ত।
