বাজেট কি চাপা পড়ে গেল?

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৫, ০৩:৩০ এএম

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ঘটনাপ্রবাহে সম্ভবত চাপা পড়ে গেল এবারের বাজেট। কিন্তু আলোচনায় চাপা পড়লেও বাজেটের প্রভাবে সারা বছর মানুষ চাপেই থাকবে, সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। একটু পুরনো বিষয় হলেও (!) বাজেটের আলোচনার আগে দেখে নেওয়া যাক, দেশের সামগ্রিক অর্থপ্রবাহের একটা ছোট অংশ, যা দিয়ে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চের শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের ১১ হাজার ৩৬২টি শাখায় মোট গ্রাহক হিসাব  ১৬ কোটি ৫৭ লাখ ৬ হাজার ৮২১টি। গত বছরের ডিসেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩২। অর্থাৎ ৩ মাসে গ্রাহক হিসাব বেড়েছে ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৮৯টি। অন্যদিকে মার্চের শেষে ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকের মোট ঋণ হিসাব ছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৪৩ হাজার ২৩১টি। গত ডিসেম্বর শেষে গ্রাহকের ঋণ হিসাবের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ২৭ হাজার ৮১০। এর মানে ৩ মাসে ঋণ হিসাব বেড়েছে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৪২১টি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে ছিল ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে ৩ মাসে আমানত বেড়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তাতে মার্চের শেষে ব্যাংকে গ্রাহকের মাথাপিছু আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯ টাকা, যা ডিসেম্বরে ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৯০ টাকা। অর্থাৎ ৩ মাসে গ্রাহকের মাথাপিছু আমানত বেড়েছে ৬৮৯ টাকা। মার্চে ব্যাংকে গ্রাহকদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৬৩ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, মার্চের শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১২ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। ৩ মাসে ঋণ বেড়েছে ২৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ঋণ হিসাবধারীর সংখ্যা। ১৬ কোটি আমানতকারীর বিপরীতে সোয়া ১ কোটি হিসাবে সব ঋণ পুঞ্জীভূত হয়েছে। অর্থাৎ অধিকসংখ্যক মানুষ ব্যাংকে নানা অঙ্কের অর্থ জমা করছেন। সে তুলনায় অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে সব ঋণ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। ঋণ বিতরণের ব্যবস্থাতেও  বৈষম্য প্রকট। এ রকম পরিস্থিতিতে অর্থ উপদেষ্টা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। সাধারণভাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে মোট ৫ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা বা জিডিপির ৯ শতাংশ রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস এবং ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের ব্যয়ের খাতের মধ্যে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদ ব্যয় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ ও সার বাবদ ভর্তুকি দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থনৈতিক এই হিসাব-নিকাশ বুঝতে অসুবিধা হলেও এর প্রভাব অর্থনীতিতে কি পড়বে তা সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েই বুঝবেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার বিষয় নয়, এর প্রভাব বাজারে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে তার প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাজেট বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে আমরা যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বনভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ। যার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন হবে এ দেশের মানুষের জীবনমানের এবং মুক্তি মিলবে বৈষম্যের দুষ্টচক্র থেকে।’ তিনি বলেন, ‘যে স্বপ্নকে ধারণ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিত রচিত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সুন্দর, বাসযোগ্য আবাসস্থল রেখে যেতে চাই, জনগণের জীবনযাত্রায় নিয়ে আসতে চাই এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ঢেউ। আমরা সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবারের বাজেট সাজানোর চেষ্টা করেছি।’ কিন্তু বাজেটে আশার রেখা এত ক্ষীণ যে, তার ওপর ভরসা করা কঠিন। প্রথমত রাষ্ট্রের আয়ের উৎসগুলো আগের মতোই আছে। এ কথা সবাই জানে, রাষ্ট্রের আয়ের কতকগুলো উৎস আছে। নাগরিকদের কাছ থেকে নানাভাবে কর আদায় করাই রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর ও করবহির্ভূত আয়। প্রত্যক্ষ করের মধ্যে আছে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কর (করপোরেট কর), দান কর, উত্তরাধিকার কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি। আর পরোক্ষ কর হচ্ছে আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), সম্পূরক শুল্ক এ রকম নানা ধরনের কর। কর ছাড়া আরও আয় আছে। যেমন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়; ডাক, তার ও টেলিফোন থেকে আয়; পরিবহন আয়, জরিমানা ও দণ্ড থেকে আয়; ভাড়া, ইজারা, টোল ও লেভি থেকে আয় ইত্যাদি। এসব আয়ের খাতগুলো খুব কি পরিবর্তিত হয়েছে এবারের বাজেটে? বাজেটকে বলা হয় দেশের জনসাধারণের দেওয়া নানা রকম ট্যাক্স বা কর হিসেবে বা পাওয়া যাবে ও করের বাইরে থেকে যা পাওয়া যাবে, এসব মিলিয়ে একটা সম্ভাব্য আয়ের পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন ও চলতি (রাজস্ব) খাতে ওই আয় খরচ করার একটি বার্ষিক হিসাব। এখানে দেখতে হবে রাষ্ট্র কার কাছ থেকে আয় করে কাদের জন্য ব্যয় করে। এর মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য। বহুল কথিত কালো টাকা সাদা করার নীতি বহাল থাকছে। আয়করের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানো হয়নি, সেই সাড়ে তিন লাখ টাকাই থাকছে, কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে বেকারত্ব কমবে এমন দিশা দেখা যাচ্ছে না, তরুণদের উদ্যোক্তা বানানোর পুরনো কথাই নতুন করে বলা হলো, কিন্তু ১০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ক্যাপিটালে তা কতটুকু গতি পাবে তা আশা জাগানিয়া নয়।

অর্থনীতি নিয়ে যারা ভাবেন তারা বলছেন, দেশ বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ২০২৪ সালে ২০ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে স্বল্প ব্যয় (জিডিপির যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ) এবং শিক্ষার দুর্বল ফলাফল ও তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ না থাকার হার (জাতীয়ভাবে ৪১ শতাংশ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৬২ শতাংশ)। ফলে জনসংখ্যার সুফল পাওয়ার কথা বলা হলেও তা অর্জন করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ দেখা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে বহুমুখী সমস্যার কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করাও কঠিন বলে মনে করছেন তারা। বাজেট এই আশঙ্কা দূর করার কোনো পথরেখা দেখাতে পারেনি এবারও। গ্রামে কাজ নেই শহরে চলে আসছে কর্মক্ষম মানুষেরা। পুঁজি সঞ্চয়নের ফলে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে, কিন্তু শহরগুলো বাসযোগ্য হচ্ছে না। শ্রমবাজারে ২২ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী আসছে, কিন্তু কর্মসংস্থান কোথায় এবং কীভাবে? জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, ভয়াবহ পরিস্থিতির লক্ষণ দেখছে মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে এর কারণে বাংলাদেশের জিডিপির ৫ থেকে ৭ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার পথ কী এবং পদক্ষেপ কী তা দেখা গেল না বাজেটে।

আন্দোলনরত শ্রমিকরা মজুরি চায় মালিকদের কাছে, কিন্তু সরকারের কাছে চায় বাজারদর নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি। রেশন দরে খাদ্য, খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৃষি খাত, ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর উন্নতির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা খাত আর বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য শিল্প সহায়ক অর্থনীতির প্রত্যাশা এবারের বাজেটেও আশা জাগাল না। গত বছরগুলোর ছায়া থেকে বের হওয়ার জন্য অর্থনীতিতে বাঁকবদল দরকার ছিল। তা যেহেতু ঘটেনি ফলে বাজেট তা করতে সক্ষম হবে এমন ভরসা কি পাবে জনগণ? করের বোঝা, দাম ও মূল্যস্ফীতি, কাজের সন্ধানে তরুণদের ছোটাছুটি আর ব্যবসায়ীদের নানা সুবিধার যে পুরনো পথ সেই পথ পরিত্যাগের লক্ষণ দেখা গেল না। ফলে তিন শূন্যের কথা শুনেও প্রতিশ্রুতি পূরণের শূন্য দশা থেকে মুক্তি মিলবে এমন ভরসা বাজেট দেখাতে পারেনি। পরিবর্তনের আশা এবং বৈষম্য মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দুর্নীতি আর দুর্বিনীত শাসক জনগণের ক্ষোভ শুধু বাড়িয়ে তোলেনি, মানুষের মনে এই প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিল যে, শাসক পরিবর্তনের ফলে মানুষের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথ রচনা শুরু হবে। দেশ গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে, টাকা পাচার বন্ধ হবে, শ্রমিক-কৃষকের আকাক্সক্ষা পূরণ না হলেও তাদের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করবে পরবর্তী সরকার। দেশের সামর্থ্য অনুযায়ী বাজেট হবে এবং সেই বাজেটে সাধারণ মানুষের প্রতি সরকার তার দায়িত্বের প্রতিফলন ঘটাবে। বাজেট হলো কিন্তু আশার প্রতিফলন কি দেখা গেল?

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত