‘জুলাই সনদ’কে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ ‘জুলাই সনদ’ ঘোষিত হলে রাজনীতিতে কোন ধরনের গুণগত পরিবর্তন আসবে তা স্পষ্ট নয়। এখনো রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক পক্ষ পরিষ্কার নয়, ‘জুলাই সনদে’ আসলে কী ধরনের কথা লেখা থাকবে? যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ ও সংস্কার কার্যক্রম হবে। গত শুক্রবার (১৩ জুন) যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন কথা বলেছেন। আলোচিত জুলাই সনদ ঘোষণার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসতে যাচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এ আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হবে আগামী বুধবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে। এটি কমিশনের দ্বিতীয় অধিবেশনের শেষ বৈঠক। বৈঠকে আলোচিত ‘জুলাই ঐক্য ঘোষণাপত্র’ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। এতে প্রায় ৩০টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলো কোন বিষয়ে একমত, কোন বিষয়ে একমত নয় বা আংশিকভাবে একমত তা চূড়ান্ত হবে। এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে।
এরই মধ্যে এনসিপি জানিয়েছে, জনগণের দাবি তথা ‘জুলাই সনদ’ রচনা ও কার্যকর করার আগে নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলে জনগণ তা মেনে নেবে না। কাজেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংস্কারের বিষয়গুলোর ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও জুলাই সনদ রচনা এবং কার্যকর করে আসন্ন জুলাইকে যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করার উদ্যোগ নিতে সরকারকে জোর দাবি জানিয়েছে এনসিপি। জুলাই মাসে দেশের সব রাজনৈতিক দলের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ ঘোষণা করে তার ভিত্তিতে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, ‘জুলাই সনদ’ একটি কাগজে লেখা ঘোষণা হবে। সবাই জানেন এর কোনো অর্থ থাকবে না। অবশ্যই এটি হবে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার দলিল। জনগণ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিক ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তাহলেই তা আমাদের রাজনীতিকে সংঘাত, অনাস্থা ও কর্তৃত্ববাদী দুষ্টচক্র থেকে বের করে আনতে পারে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চাইছেন, ‘এই আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক দলগুলো লিখিতভাবে অনুমোদন করুক। যাতে ভবিষ্যতে এগুলোর মৌলিক রূপ পরিবর্তন না হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি স্থায়ী প্রতিশ্রুতি গড়ে ওঠে।’ এটা একেবারেই যৌক্তিক এবং ন্যায়সংগত বিষয়। এ ব্যাপারে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই।
তবে জুলাই সনদের নির্দিষ্ট কোনো ধারার বিষয়ে যেকোনো রাজনৈতিক দলের দ্বিমত থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অবশ্যই হতে হবে সর্বজনীন। যে বিষয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ও মানুষের সম্মতি থাকবে, তা হবে গ্রহণীয় এবং যেখানে থাকবে না তাকে বর্জন করাই শ্রেয়। এমন কোনো বিতর্কে জড়ানো ঠিক হবে না, যা আমাদের ঐক্যকে বিনষ্ট করতে পারে। এর ফলে অশুভ এবং অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান পথকেই মসৃণ করবে। দলগুলোর কোন কোন বিষয়ে পূর্ণ বা আংশিক একমত আর কোন বিষয়গুলোয় মতানৈক্য রয়েছে তা স্পষ্ট করে প্রকৃত অর্থেই একটি ঐকমত্যের কাঠামো গড়ে তোলা হোক। আমরা আর রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না। দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো একটি প্ল্যাটফর্মে এসেছে। এই ঐক্যকে যেকোনোভাবে ধরে রাখতে হবে। না হলে আমরা সমষ্টিগতভাবেই ক্ষতির মুখোমুখি হব। তখন দেশকে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে অগ্রসর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। জুলাই সনদ হোক, আগামীর উজ্জ্বল বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুদৃঢ় রক্ষাকবচ। যার মাধ্যমে রক্ষিত থাকবে দেশ-মানুষের স্বপ্নময় বাংলাদেশের বর্ণমালা। একতা, সাম্য, সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ কে না চায়?
