বিদ্যুতে ২৫ হাজার কোটির ভর্তুকি সমন্বয়ের চিন্তা

আপডেট : ২১ জুন ২০২৫, ০৭:২৯ এএম

বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ব্যয়বৃদ্ধির লাগাম টানতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে আসন্ন অর্থবছরে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমানোর কথা ভাবছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে এ ভর্তুকি সমন্বয় করার কথা ভাবছে সরকার। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে ভুলনীতি আর নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দিনে দিনে ব্যয় বেড়েছে এবং এখনো বাড়ছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে বসিয়ে রেখে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ (কেন্দ্রভাড়া) দিতে হয়েছে। ভর্তুকির সেই জের এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশকে ঋণের শর্ত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের তাগিদ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির একটি প্রতিনিধিদল এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। গত বুধবার থেকে তারা বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, যা চলবে পহেলা জুলাই পর্যন্ত। এ সময়ে বিদ্যুৎ বিভাগ, পিডিবিসহ অন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে তাদের বৈঠকের কথা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফের শর্ত মানতে গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে হবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দাম না বাড়িয়ে বিকল্প উপায়ে ভর্তুকি সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। বিদ্যুতের দাম যদি বাড়াতেই হয় তাহলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা। অথচ গড় উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকা ১৫ পয়সা। ফলে বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্রমতে, সফরকালে সরকার ভর্তুকি হ্রাস ও এ খাতে আর্থিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য গত ৯ মাসে গৃহীত সংস্কার পদক্ষেপ সম্পর্কে আইএমএফকে অবহিত করবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যয় সাশ্রয়ী ৯টি উদ্যোগ ইতিমধ্যে চালু করা হয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে কয়লার মূল্য নির্ধারণের সূত্র সংশোধন করা। এতে সরকারের প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা।

তিনটি যৌথ উদ্যোগের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি, বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি এবং আরপিসিএল-নোরিনকো পাওয়ার প্ল্যান্টকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য তাদের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে (পিপিএ) অসংগতি পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিপিএ পুনর্মূল্যায়নের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে বছরে সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ২ হাজার ৬শ কোটি টাকা। এ খাতে সংস্কারের মাধ্যমে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা কর্মকর্তাদের।

ভর্তুকির লাগাম টানতে পুরনো, অদক্ষ ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ ও সিস্টেম লস কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো, কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সস্তা জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, পিডিবি ও অন্য সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যয় হ্রাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে সব ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হওয়াসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা চলছে; যেমন গুলশান, বনানী ও ধানম-ির মতো উচ্চআয়ের এলাকাগুলোতে বিদ্যুতের দাম বেশি হতে পারে।

সরকার তিন বছর মেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য একজন পরামর্শক নিয়োগের জন্য আইএমএফকে অনুরোধ করেছে বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা।

আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তির আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ভর্তুকি কমাতে শেখ হাসিনা সরকার প্রতি তিন মাস অন্তর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, ‘অনেক চাপ সত্ত্বেও আমরা বিদ্যুতের দাম বাড়াইনি। এ মুহূর্তে দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেই। নিকট ভবিষ্যতেও দাম বাড়বে না। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও খাতভিত্তিক সংস্কারের মাধ্যমে ভর্তুকি কমাতে চায়। সাশ্রয়ী হওয়ার, কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ যৌক্তিক ও সহনীয় মূল্যে মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা এ সরকারের মূল উদ্দেশ্য।’

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি সমন্বয় করা হলে কোনো কোম্পানি লাভজনক থাকবে না। লাভ পাওয়া না গেলে কোম্পানি গঠনের সার্থকতা নেই। সরকারের আর্থিক সংকট মোকাবিলা করতে কোম্পানিগুলোকে লাভজনক হতে হবে।’

বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য একটি চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যেখানে ইউনিটপ্রতি ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ টাকা ৪ পয়সা। সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এ রেট বেঞ্চমার্ক হিসেবে কাজ করবে।

উৎপাদন ব্যয় কমাতে অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি গ্যাস ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের শুল্ক পুনর্নির্ধারণের কাজ চলছে। স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) জন্য ক্যাপাসিটি চার্জসহ শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনার লক্ষ্যে একটি কমিটিও করা হয়েছে। এখন থেকে খরচ কে কতটা কমাতে পেরেছে তার ভিত্তিতে সংস্থা বা কোম্পানিগুলোকে মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় সংকোচনের জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) দায়িত্ব দিতে হবে। যাদের পয়সা দিয়ে এ খাত চলে সেই ভোক্তা এবং বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজন নিয়ে বিইআরসি একটি কমিটি গঠন করে দিলে তারাই দেখিয়ে দেবে কীভাবে কোন খাতে অযাচিত ব্যয় ও অপচয় কমানো যায়। আমলাদের কথামতো চিঠি চালাচালি করে ব্যয় কমানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ খাতে অপচয়, চুরি, লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমানো গেলে ভর্তুকি বাড়ানো নয়, বরং কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।’

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল ৬ টাকা ৬১ পয়সা এবং পাইকারি বিক্রির দর ছিল ৫ টাকা ১৩ পয়সা। প্রতি ইউনিটে পিডিবির ১ টাকা ৪৮ পয়সা লোকসান ছিল। এখন গড় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৩১ টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৭ টাকা ৪ পয়সা। প্রতি ইউনিটে লোকসান হচ্ছে ৫ টাকা ২৭ পয়সা।

২০০৯ সালে বিদ্যুতের খুচরা দাম ছিল ইউনিটপ্রতি ৩ টাকা ৭৩ পয়সা। গত ১৫ বছরে প্রতি ইউনিটের খুচরা দাম বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ২৫ পয়সা। দাম বাড়িয়েও লোকসান কমেনি। ভর্তুকির মাধ্যমে লোকসান সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়ে হয়েছে ৬২ হাজার কোটি টাকা।

প্রতিবছর ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতেই চলে যায়। বিদ্যুৎ না কিনলেও চুক্তি অনুসারে যে অর্থ দিতে হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র মালিককে তা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে পরিচিত। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫৪ শতাংশ বেশি আছে। ফলে বিদ্যুৎ না কিনেও বিদ্যুৎ বিভাগকে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের পকেটে গেছে।

অতিরিক্ত সক্ষমতার বিদ্যুৎ এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের শেষে রিজার্ভ মার্জিন, ক্যাপাসিটি ও সর্বোচ্চ চাহিদার মধ্যে পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬২১ মেগাওয়াট। বার্ষিক চাহিদা বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হলেও প্রকৃত প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে। আদর্শ রিজার্ভ মার্জিন ২০ শতাংশ হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এটি প্রায় ৪১ শতাংশ, যা বিনিয়োগের সুযোগ ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত