ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কষে চড় মেরেছে : খামেনি

আপডেট : ২৭ জুন ২০২৫, ০৮:০৩ এএম

ইরানের সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, সেই আয়াতুল্লাহ খামেনিকে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতকালের পুরো সময় জুড়ে খামেনি দৃশ্যপটের আড়ালেই থেকে গেছেন। দেশের এই সংকটের মধ্যে কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি কিংবা ধারণকৃত বার্তা দেননি। তার এ অনুপস্থিতি রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিস্ময় ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের সাধারণ মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, মহান ইরানি জাতি ভুয়া জায়নবাদী শাসনের ওপর বিজয় অর্জন করেছে।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, এত হম্বিতম্বি ও অহংকার সত্ত্বেও ইরানের আঘাতে ইসরায়েলের শাসনব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে হস্তক্ষেপ করেছে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, যদি তারা হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে জায়নবাদী শাসন ধ্বংস হয়ে যাবে। খামেনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মুখে জোরালো চড় মেরেছি। ইরানের প্রতি আত্মসমর্পণের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মতো ব্যক্তির মুখে শোভা পায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকতে পারা এবং সফলভাবে হামলা করাটা ইরানের একটি দুর্দান্ত পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে ফের ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও এ পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি করা হবে। খামেনি বলেন, ইরানি সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েলের নগর ও সামরিক এলাকার বহু-স্তরীয় প্রতিরক্ষা এবং লক্ষ্যবস্তু ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের শত্রুরা ক্ষেপণাস্ত্র বা আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো অজুহাত ব্যবহার করে, কিন্তু তারা আসলে আমাদের আত্মসমর্পণের জন্য অপেক্ষা করছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ছিল ট্রাম্পের ‘শোম্যানশিপ’, এর বেশি কিছু নয়। খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে, কিন্তু তেমন কিছু অর্জন করতে পারেনি।

ভ্রান্ত ইহুদিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় হয়েছে।

চীন সফরে গেলেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী : রাষ্ট্রীয় সফরে নিজেদের বিশ্বস্ত মিত্র এবং বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার চীন সফরে গিয়েছেন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ। চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জোট সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের উপকূলীয় শহর কুইংদাওয়ে অবস্থান করছেন তিনি। টানা ১২ দিনের সংঘাত শেষে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে গত ২৪ জুন যুদ্ধবিরতিতে গেছে ইরান এবং ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম চীন সফরে গেলেন ইরানের কোনো মন্ত্রী। রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরান, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও বেলরুশ ৯ দেশের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জোট এসসিওর যাত্রা শুরু ২০০১ সাল থেকে। গত বুধবার থেকে শুরু হয় দুদিনব্যাপী ৯ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের এ সম্মেলন।

বুধবার সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে দেওয়া বক্তব্যে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডন জুং বলেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ইস্যুতে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে ভিন্ন। নিজ বক্তব্যে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইরানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য বেইজিংকে ধন্যবাদ জানান। নাসিরজাদেহ বলেছেন, তেহরান আশা করে যে বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস করতে চীন তার গঠনমূলক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।

ইরানের পরমাণু স্থাপনায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে : সিআইএ

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় গুরুতর ক্ষতি হয়েছে এবং এতে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ। তিনি জানান, ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। যদিও পুরো কর্মসূচি ধ্বংসের কথা তিনি বলেননি। এর আগে প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামলার পরও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মূল উপাদানগুলো অক্ষত রয়েছে। ওই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার অক্ষত থাকতে পারে : জাতিসংঘ

ইসরায়েল ও মার্কিন হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। বুধবার আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রসি বলেছেন, হামলা শুরু হতেই ইউরেনিয়াম সরিয়ে থাকতে পারে তেহরান। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে গ্রসি বলেছিলেন, পারমাণবিক উপাদান ও সরঞ্জাম রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে সংঘাত শুরুর প্রথম দিনই অর্থাৎ ১৩ জুন একটি ইঙ্গিত পেয়েছিলেন তিনি। গ্রসি বলেন, ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পরোক্ষ অর্থ থেকে আমরা শুধু ধারণা করতে পারি, তাদের ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার টিকে আছে।

বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ইরানের : ইসরায়েল ও তার মিত্রদের সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করায় বাংলাদেশের সরকার, জনগণ ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাস।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দূতাবাস জানায়, বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ, শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সংহতি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং বিবৃতিগুলো মানবিক চেতনা, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি একটি গঠনমূলক ও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতির প্রতিচ্ছবি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইরানি জনগণের প্রতিরোধ কেবল জাতীয় ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার দৃঢ় সংকল্পের প্রকাশ। একইসঙ্গে এটি আধিপত্যবাদ, জবরদস্তিও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট বার্তা বহন করে।

ইরান দূতাবাস আরও জানায়, ‘আমরা বিশ্বাস করি যে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুধু বৈধ অধিকারই নয়, এটি একটি নৈতিক এবং মানবিক দায়িত্বও বটে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে প্রকাশিত মূল্যবান সমর্থন আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।’

বিজ্ঞপ্তির শেষে বলা হয়, সহিংসতা ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতিগুলোর পারস্পরিক সংহতি আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন সময়ে বাংলাদেশের জনগণ যে ভ্রাতৃসুলভ অবস্থান নিয়েছে, তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত