বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) নোয়াখালীর উপপরিচালক নুরুল আলম (বীজ বিপণন ও উদ্যান)। দায়িত্ব পালন করছেন নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলার বীজ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে। বিএডিসির পক্ষ থেকে ওই তিন জেলার কৃষকদের বীজ সরবরাহ করা ও সে লক্ষ্যে বীজ সংগ্রহ-ক্রয়ের কাজটিও হয় তার অধীনেই। আর সে কাজে মাঝেমধ্যেই থাকে অনিয়মের অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে নানা খাতে আর্থিক অনিয়মেরও। এমনকি মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী ও অনিয়মিত শ্রমিকদের নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। তার এ অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। আশ্চর্য কারণে, বিস্তর অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিএডিসি, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষক ও কর্মচারীরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুরুল আলম নামে-বেনামে অনিয়মিত শ্রমিক, মৃত ব্যক্তি এবং প্রবাসীদের নামে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খুলে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
বিএডিসির নোয়াখালী কার্যালয়ে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক ছিলেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার আবুল কাশেম মনির হোসেন। অসুস্থতাজনিত কারণে ২০২৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুসনদ অনুযায়ী তিনি এপ্রিল মাসের ২০ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তবে বিএডিসির হাজিরা খাতায় তাকে জীবিত দেখানো হয়েছে এবং তার নামে ভাতা ও ঈদ বোনাস উত্তোলন করা হয়েছে। মনিরের পরিবার জানায়, তারা এই অর্থের কোনো অংশ পায়নি বা এ বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই। একইভাবে, সাইফুল ইসলাম নামে এক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক একই সময়ে বিএডিসির অ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টার এবং বীজ বিপণন শাখায় কাজ করেছেন বলে হাজিরা খাতায় দেখানো হয়েছে। তিনি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চুক্তিভিত্তিক চাষি হিসেবেও ৪ লাখ ৭ হাজার টাকা পেয়েছেন। সাইফুলের ভাই শামসুল ইসলাম প্রবাসে থাকলেও তার নামে ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে। এ ছাড়া, মনির হোসেনের স্ত্রী মুক্তা আক্তার (যিনি নোয়াখালীতে কখনো আসেননি) তাকেও অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে দেখিয়ে ভাতা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
মনির হোসেন, সাইফুল ইসলামের মতো এমন ১৫ থেকে ২০ জনের নামে বিএডিসির অ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টার ও বীজ বিপণন থেকে নিয়মিত মজুরি তোলা হচ্ছে। চাকরি না করেও অনেকে পাচ্ছেন বোনাস। রহমত উল্যাহ রাজু নামে এক অটোচালক অনিয়মিত শ্রমিক হিসেবে বেতন নিচ্ছেন অথচ যার কোনো অস্তিত্বই নেই ওই অফিসে!
নথিপত্রে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ ভাতার নামে অর্থ উত্তোলন করা হলেও তালিকাভুক্ত অনেকেই প্রশিক্ষণে অংশ নেয়নি। এ ছাড়া, নুরুল আলমের বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে নি¤œমানের নারিকেল বীজ ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। নারিকেল বীজ ক্রয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ৬৮ টাকা দরে বীজ কেনার নির্দেশ থাকলেও তিনি স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৪৯ টাকা দরে নি¤œমানের বীজ কিনেছেন, কিন্তু হিসাবে ৬৮ টাকা দেখিয়েছেন। এতে মোটা অঙ্কের অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে।
নুরুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ঘুষ ছাড়া ডিলারদের বীজ বা সার সরবরাহ করেন না। তার ভাই সাইফুল আলমকে বিএডিসির ফার্নিচার সরবরাহের ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও সাজানো দরপত্রের অভিযোগও উঠেছে। এ ছাড়া, অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি যা হিসাবরক্ষণ শাখার কাছে থাকার কথা তা তিনি নিজের কক্ষে তালাবদ্ধ রাখেন।
তার এসব অনিয়মের পাশাপাশি শ্রমিকদের দিয়ে বাড়তি পরিশ্রম করিয়ে সে জন্য ভাতা না দেওয়ার অভিযোগ আছে। কাগজপত্রে ‘ওভার টাইম’ পরিশোধ দেখিয়ে সে টাকা তিনি আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ শ্রমিকদের। শ্রমিকদের হাজিরা খাতায়ও গড়মিল পাওয়া গেছে। খাতায় চার জন শ্রমিকের নাম থাকলেও কাজ করেছেন মাত্র দুজন।
দৈনিক বেতনভোগী শ্রমিক জাহিদ জানান, নুরুল আলম তাদের ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করেন, কিন্তু বাড়তি মজুরি দেন না। অথচ শুনতে পাই, আমাদের ওভারটাইমের বিল অফিস দিয়ে দিয়েছে!
২০২৩ সালের নভেম্বরে নুরুল আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া চালানের মাধ্যমে ধান ও বীজ সিলেট ও সুনামগঞ্জে বিক্রির অভিযোগ উঠে।
অনিয়মের বিষয়ে নুরুল আলমকে প্রশ্ন করতে গেলে তিনি প্রতিবেদককে ‘ঘুষ’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিবেদক সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় মানহানির মামলারও হুমকি দিয়েছেন। তার দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে না।
বিএডিসির অ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টারের মহাব্যবস্থাপক ড. মো. ইসবাত বলেছেন, অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের হয়রানি করেন। নুরুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
