অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক রক্ষা করে এগিয়ে যেতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। দলটি যখন নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার তখন অন্তর্বর্তী সরকার নিজস্ব গতিতে এবং নীতিতে পথ চলতে চাচ্ছে; তারা সংস্কার ও বিচারপ্রক্রিয়া যথেষ্ট মাত্রায় এগিয়ে নিতে চায়। সংস্কারে ও বিচারে বিএনপিরও আপত্তি নেই। এ ব্যাপারে দুপক্ষের পার্থক্যটা হচ্ছে মাত্রাগত। দৃশ্যত ভোট কিছুটা কৌশলের গ্যাঁড়াকলে পড়েছে।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করে নিতে চায় বিএনপি; যদিও সরকার বলেছে, কিছু প্রস্তুতির সাপেক্ষে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন আদায় করা ও নির্বাচন অনুষ্ঠান করার মধ্যবর্তী ফারাক ঘোচানোর রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোনোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিএনপি।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও যাতে জোরালোভাবে নির্বাচনের দাবি ওঠে সে কৌশলও রয়েছে বিএনপির। এর অংশ হিসেবেই জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ছোট ছোট দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে এবং তাদের আবদারে সায় দিয়ে যাচ্ছে বিএনপি।
জানা গেছে, নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার বিএনপিকে শান্ত রাখার নীতি গ্রহণ করেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার সংস্কার ও আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার বিচার সম্পন্ন করতে চায়। এ কাজে বিএনপি বাধা হতে চায় না; আবার বিচার করতে গিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে যাক সেটাও তারা চায় না। বিএনপি বলছে, ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হতে হবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে বলে আপাত বোঝাপড়া হয়েছে।
সরকারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, ভোট নিয়ে সব রাজনৈতিক দলই নিজস্ব সুবিধা দেখছে। ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করেনি সরকার; রাজনৈতিক দলগুলোও এখন পর্যন্ত ভোটের তারিখ আদায় করতে পারেনি। উভয়পক্ষই তাদের নিজস্ব কৌশলে রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে আভাস মিললেও তারিখ এখনো অঘোষিতই রয়ে গেছে। বিএনপিসহ কয়েকটি দলের নেতারা বিভিন্ন সভায় সরকারকে জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানাতে বলেছে। এ প্রেক্ষাপটেই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠক হয়েছে। সম্ভবত এটা লন্ডন বৈঠকের ফলোআপ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ সাক্ষাতের পর জাতীয় নির্বাচনের তফসিলের আগে একটি সুনির্দিষ্ট ভোটের তারিখ ঘোষণা করা হতে পারে। এমনও হতে পারে, অনুষ্ঠিত বৈঠকের সারমর্ম তুলে ধরতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফুল কমিশন বৈঠক করতে পারেন। দৃশ্যত ভোট কিছুটা কৌশলের গ্যাঁড়াকলে পড়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন আদায় করার লক্ষ্যে কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। সহনশীল সুরে কথা বলে নির্বাচন আদায় করে নেওয়াই এখন বিএনপির মূল লক্ষ্য। তারেক রহমানের সঙ্গে সরকারপ্রধানের বৈঠকের পর বিএনপিতে এ পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তাগুলো তুলে ধরে জনগণ ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এক কাতারে নিয়ে আসাই বিএনপির লক্ষ্য। রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করে তোলা, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে এনে অর্থনীতি মজবুত করে তুলতে নির্বাচন ও নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প নেই এটি বুঝিয়ে জনমত সৃষ্টি করতে চাচ্ছে দলটি। তাদের লক্ষ্য আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আদায়।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ‘নির্বাচন ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করা হচ্ছে। অথচ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরেও সংস্কার ও বিচারকাজ চালানো সম্ভব।’ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একই ছাতায় নিয়ে আসার জন্য ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে বিএনপি। তাদের বক্তব্য হলো, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টখ্যাত আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে হলে আপাতভাবে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান দরকার। তা না হলে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন উপায়ে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসবে।
ভোট আদায় করার লক্ষ্যে সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ওঠাবসা বাড়িয়েছে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তারাও যেন ভোট আদায়ে জনমত তৈরি করায় যুক্ত হন। সরকারের ওপর নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে জোরালো লবিং অব্যাহত রেখেছে বিএনপি।
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে আগামী নির্বাচন করার জন্য জামায়াত, অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলো একাট্টা হলেও সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে এক কাতারে নেই অনেক দলই। তৃণমূলের রাজনীতি সাজিয়ে নিতে আরও কিছুটা সময় পাওয়া গেলে ভালো কিছু করার আশা জামায়াতের। ভোট বিলম্ব হলেও জামায়াতের তেমন আপত্তি নেই বলে বলা হয়েছে গত সোমবার। মৌলিক সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য না হলে গণভোট চায় জামায়াতে ইসলামী। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিংয়ের বৈঠকে এ অবস্থান তুলে ধরেছে জামায়াত। জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও জামায়াত সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে বেশি।
এনসিপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে, নির্বাচনের জন্য আরেকটু সময় হাতে পেলে তারা বেশ ভালো অবস্থায় যেতে পারবে। বিএনপির সঙ্গে তাদের পার্থক্যের জায়গা হলো আগামী ছয় মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ক্ষমতায় তারাই যাবে। জামায়াত মনে করে, রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থায় থাকতে গেলে নির্বাচন একটু পেছালে ভালো হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংস্কারের কথা বলে নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কারের জন্য নির্বাচন থেমে থাকতে পারে না। নির্বাচন যত দেরি হবে সংকট তত ঘনীভ‚ত হবে।’
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘দেশে মব জাস্টিসের ঘটনা ঘটছে কারণ এখন নির্বাচিত সরকার নেই। দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, সংস্কার, বিচার ও মব জাস্টিসÑ এ চারটি বিষয় নিয়েই বিতর্ক চলছে। মব জাস্টিসের মতো ঘটনা ঘটছে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সবসময় সংস্কারের প্রয়োজন হয়। বিচার প্রক্রিয়াও আমাদের চালিয়ে যেতে হবে, তবে এজন্য নির্বাচন পেছানো উচিত হবে না। নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন হওয়া উচিত। জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।’
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাচনের পথে হাঁটছে না এ অভিযোগ যাতে কোনো পক্ষই তুলতে না পারে সেদিকে বেশ সতর্ক রয়েছে সরকার। ঐকমত্য কমিশন একটি স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে এসব বৈঠকে যেসব পরামর্শ আসছে সেগুলোকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকার নির্বাচনের পথেই হাঁটছে। দ্বিতীয় পর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কমিশনের এখন পর্যন্ত পাঁচ দিন বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হয়েছে। এর আগের পাঁচ দিনে আলোচনা হয়েছে নয়টি বিষয়ে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি দলগুলো।
দ্বিতীয় পর্বে নয়টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এগুলো হলো সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন, বিরোধী দল থেকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা, ১০০ নারী আসনে সরাসরি ভোট, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল এবং সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি।
এর মধ্যে প্রথম দুটি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এর বাইরে কিছু ক্ষেত্রে আংশিক ঐকমত্য হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো আলোচনার টেবিল থেকে এখনো বাদ দেওয়া হয়নি। সেগুলো নিয়েও ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামী জুলাইয়ের মধ্যে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের। যদিও কোনো কোনো দলের মুখে এ আলোচনা নিয়ে হতাশা ফুটে উঠেছে। জুলাই সনদ ঘোষণা করা হলে রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক দাবি-দাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হবে বলে মনে করছে তারা। জুলাই সনদও নির্বাচন বিলম্বিত করার নিয়ামক কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিএনপি কোনদিকে যাবে সেই কৌশল এখনো নির্ধারণ করতে না পারলেও দলটিকে নির্বাচনের দাবি থেকে সরানো সম্ভব হবে বলে ধারণায় রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
নির্বাচন নিয়ে কী আলোচনা হলো, জাতিকে জানান: সালাহউদ্দিন
ছাড় দিয়ে ঐকমত্যে না আসলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না: গোলাম পরওয়ার