দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি

৪৭তম সার্কফিন্যান্স গভর্নরস সিম্পোজিয়াম কী বার্তা দিলো?

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৫, ১১:০১ পিএম

২০২৫ সালের ২৬ জুন, ঢাকা শহরের এক অভিজাত কনফারেন্স সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো ৪৭তম সার্কফিন্যান্স গভর্নরস্ সিম্পোজিয়াম—যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে গঠিত হলো নতুন প্রত্যাশা ও নীতির ভিত্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে সার্কভুক্ত আটটি দেশের মধ্যে ছয়টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন গভর্নর, ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—“অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং: সার্ক অঞ্চলের বৈষম্য দূরীকরণ।”

দক্ষিণ এশিয়া, যেখানে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের বসবাস, সেই অঞ্চলের একটা বড় অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি উন্নয়ন নীতি নয়, বরং এটি দারিদ্র্য হ্রাস, নারী ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই সিম্পোজিয়াম দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে একটি গঠনমূলক বার্তা বহন করে।

উদ্বোধনী ভাষণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির কোনো যাদুর কাঠি নেই।” তার মতে, অন্তর্ভুক্তির পথ বহুস্তরীয় ও জটিল—যেখানে প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক নীতি, সঠিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বয়। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, সার্ক অঞ্চলের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ‘সার্কফিন্যান্স’ একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে চলেছে। এটি প্রযুক্তিগত সংলাপ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের গ্লোবাল ফিনডেক্স রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১১ সালে যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ শতাংশে। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও অঞ্চলজুড়ে বৈষম্য প্রকট। শ্রীলঙ্কায় অ্যাকাউন্টধারীর হার ৮৯.৩ শতাংশ, ভারতে ৭৭.৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ৫২.৮ শতাংশ, পাকিস্তানে ২১ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ১০ শতাংশেরও নিচে।

ব্যাংকিং অবকাঠামোর দিক থেকেও ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আফগানিস্তানে প্রতি এক লাখ প্রাপ্তবয়স্কদের জন‍্য ব্যাংক শাখা রয়েছে মাত্র ২টি, যেখানে ভুটানে এই সংখ্যা ১৯টি। অর্থাৎ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্তরায় কেবল সামাজিক নয়—এটি প্রাতিষ্ঠানিকও। তদুপরি, নারী-পুরুষের মধ্যেও গভীর বিভাজন দেখা যায়। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে নারী-পুরুষের মধ্যে অ্যাকাউন্টধারীদের ব্যবধান প্রায় ৩০ শতাংশ—যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। তবে ভুটানের অভিজ্ঞতা অনুকরণীয়: ২০১৭ সালে যেখানে ৩৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০.৮ শতাংশে।

এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আশার আলো ছড়াচ্ছে ডিজিটাল আর্থিক সেবা। মোবাইল মানি, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষত, বাংলাদেশে মোবাইল ভিত্তিক লেনদেনে অভাবনীয় অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০১৯ সালে যেখানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে লেনদেন ছিল ২৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে—মাত্র এক বছরে ২০২৪ সালেই এই বৃদ্ধির হার ২৮.৪২ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে পাকিস্তানে এই হার মাত্র ১৮ শতাংশ। কোভিড-১৯ মহামারি দক্ষিণ এশিয়ায় ডিজিটাল লেনদেনের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে; গবেষণা বলছে, ওই সময় প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ প্রথমবারের মতো ডিজিটাল পেমেন্ট করেছেন।

সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো নিজেদের উদ্ভাবনী উদ্যোগ তুলে ধরেন। বিশেষ করে ভারতের  ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট সিস্টেম, নেপালের কমিউনিটি-ভিত্তিক কো-অপারেটিভ মডেল এবং মালদ্বীপের ‘ফাভারা’ নামের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম তুলে ধরা হয়। এসব অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে, স্থানীয় উদ্ভাবনগুলোকে আঞ্চলিকভাবে প্রসারিত করা সম্ভব—যদি নীতিগত সমন্বয় ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদার করা যায়।

এই অভিজ্ঞতা বিনিময়ের আলোকে সার্কফিন্যান্স ২০২৫–২০৩০ মেয়াদে একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করে, যাতে বেশ কিছু দূরদর্শী পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার্কফিন্যান্স ডেটাবেইসের সম্প্রসারণ, সার্ক পেমেন্ট কাউন্সিলের কার্যক্রম আরও সুসংহতকরণ এবং আঞ্চলিক স্কলারশিপ স্কিমের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারকদের প্রস্তুত করা। একইসঙ্গে রোডম্যাপে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—জলবায়ু সহনশীলতা, লিঙ্গ সমতা, এবং তরুণদের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে।

এবারের সিম্পোজিয়ামে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স খাতেও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গ বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের বৈদেশিক আয়ের বড় অংশ আসে এই রেমিট্যান্স থেকেই। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি ১০ এর সি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার বহু রুটে এই হার এখনো ৫ থেকে ৬ শতাংশ। ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে এই খরচ কমানো সম্ভব এবং তা শুধু পরিবারগুলো নয়, দেশের বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাকেও আরও স্থিতিশীল করতে পারে।

বাংলাদেশ এবারের সিম্পোজিয়ামের আয়োজক ও সভাপতি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—এই দেশ এখন শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে অগ্রসর নয়, বরং অন্যদের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে স্কুল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, কৃষি লোন এবং নারী-বান্ধব আর্থিক পণ্যের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আর্থিক সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে পাঠ্যসূচিতে ‘ফিনান্সিয়াল লিটারেসি’ বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক নির্দেশনায় প্রতিটি ব্যাংক শাখা ন্যূনতম একটি স্কুলের সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা বলা হয়েছে। এ পর্যন্ত দেশের ১১,৩৬২টি ব্যাংক শাখার মধ্যে ৫,৫৪২টি শাখা ৫,৫৪২টি স্কুলে এ কার্যক্রম শুরু করেছে—যা এ দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। 

সবশেষে, ৪৭তম সার্কফিন্যান্স গভর্নরস্ সিম্পোজিয়াম এটাই প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি উন্নয়ন কৌশল নয়—এটি দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি অপরিহার্য শর্ত। ডিজিটাল উদ্ভাবন, লিঙ্গ সমতা এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া নির্মাণ সম্ভব। এখন প্রয়োজন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রযুক্তি-বান্ধব নীতি, এবং পরস্পরের ওপর আস্থাশীল আঞ্চলিক অংশীদারত্ব।

লেখক: ব‍্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত